
মোঃ আব্দুস ছালাম, আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় এখন বইছে সোনালী ধানের সুবাস। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে দুলছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু হবে পুরোদমে ধান মাড়াইয়ের উৎসব। তবে এই আনন্দের মাঝেও প্রকৃতির অনিশ্চয়তা কৃষকদের মধ্যে তৈরি করেছে উদ্বেগ। কালবৈশাখীর আশঙ্কায় প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি লটারি—একদিন আগে ধান ঘরে তুলতে পারলে নিশ্চিত বাম্পার ফলন, আর একদিন দেরি মানেই বড় ক্ষতির শঙ্কা।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আত্রাইয়ের ৮টি ইউনিয়নে ১৮ হাজার ৭১০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১৮ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এছাড়া ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫,০১০ হেক্টর থাকলেও অর্জিত হয়েছে ৫,১১৫ হেক্টর। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে উপজেলায় বর্তমানে ৮,১৪০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র এবং ৩,৭২০টি ধান মাড়াই যন্ত্র (পাওয়ার থ্রেসার) সচল রয়েছে।
ধান কাটা ও মাড়াইয়ের এই সংকটময় সময়ে কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল শ্যালো ইঞ্জিন চালিত যন্ত্রপাতির নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। সেই দুশ্চিন্তা দূর করতে উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিশেষ ‘ফুয়েল কার্ড’ বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারি এই উদ্যোগের লক্ষ্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করা এবং কৃষকদের জ্বালানি তেল প্রাপ্তি সহজ করা। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—সব পর্যায়ের কৃষক এই সুবিধা পাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে উপজেলায় ১,৩৫০টি কৃষক জ্বালানি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন থেকে সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও ফসল মাড়াই যন্ত্রের জন্য সহজে সরকারি নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে ডিজেল ও পেট্রোল সংগ্রহ করতে পারছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে কৃষি উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
এছাড়া ফুয়েল কার্ডের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের অপচয় ও অনিয়ম রোধ করে প্রকৃত কৃষকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পুরো কার্যক্রম উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়ে কৃষকদের সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদার বলেন, “বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময়টি কৃষকের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। সঠিক সময়ে জ্বালানি না পেলে কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। তাই এ কার্যক্রম চলমান থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে সজাগ রয়েছেন। ধান কাটা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি পাওয়ার থ্রেসার ও কৃষি পরিবহন যানের জন্য সুশৃঙ্খল তেল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। কৃষক যেন নিরাপদে তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারে—সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এড়াতে আত্রাইয়ের কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের এই সমন্বিত প্রচেষ্টা সফল হলে, এ বছর বাম্পার ফলন ঘরে তুলবে উপজেলার হাজারো কৃষক পরিবার। এখন আত্রাইয়ের আকাশে সময়ের অপেক্ষা—আর মেঘমুক্ত সোনালী রোদের প্রত্যাশা।