
খুলনা অঞ্চলে সম্ভাবনাময় ভেনামি চিংড়ি চাষ হঠাৎ করেই থমকে গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশ থেকে পোনা, খাবারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি বন্ধ থাকায় প্রস্তুত পুকুরগুলো খালি পড়ে আছে। এতে বিনিয়োগ আটকে গিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। একই সঙ্গে উৎপাদন ও রফতানি—দুই ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বুধবার (২২ এপ্রিল) খুলনার বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া ও দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গত বছর যেখানে সফলভাবে ভেনামি চিংড়ির চাষ হয়েছিল, সেই ঘেরগুলো এবার নীরব। পুকুর প্রস্তুত ও পানি ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলেও সরকারি অনুমোদন না থাকায় চাষ শুরু করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।
মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দুই দফা পাইলট প্রকল্পের পর ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন দেওয়া হয়। সর্বশেষ অর্থবছরে এ অঞ্চলের ২৫টি প্রতিষ্ঠান ১৫৩ হেক্টর জমিতে ১৪৪ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা জারি করায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় চাষি প্রসেনজিৎ বলেন, “গত বছর ভেনামি চাষ করে ভালো লাভ হয়েছিল। সেই আশায় এবারও প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ঘের প্রস্তুত করেছি। কিন্তু পোনা ও খাবার আমদানি বন্ধ থাকায় সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধু লোকসান গুনছি।”
আরেক চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, “ভেনামি চিংড়ি আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা ছিল। উৎপাদন বেশি, বাজার ভালো—সবকিছুই অনুকূলে ছিল। কিন্তু হঠাৎ নিষেধাজ্ঞায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে গেছে।”
এ বছর খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার কোথাও ভেনামি চিংড়ি চাষ না হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এই চিংড়ির সরবরাহ কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রফতানি আয়ে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, “ভেনামি চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন। কিন্তু কাঁচামাল আমদানি বন্ধ থাকায় উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দ্রুত সমাধান না হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ধাক্কা লাগবে।”
তবে চাষিদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পুনরায় অনুমোদনের বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদফতর।
খুলনার উপপরিচালক বিপুল কুমার বাসক বলেন, “ভেনামি চিংড়ি চাষে পরিবেশগত ও বায়োসিকিউরিটি বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। এ কারণে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল। তবে চাষিদের ক্ষতি ও জাতীয় অর্থনীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পুনরায় অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।”
চলতি অর্থবছরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় গলদা, বাগদা, হরিণা ও ভেনামিসহ মোট ২ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে বাগদা বা গলদায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন সর্বোচ্চ ৮ টন, সেখানে ভেনামিতে তা ২৫–৩০ টন পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এই উচ্চ ফলনশীল প্রজাতির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নীতিগত সমাধান না এলে সম্ভাবনাময় এই খাত দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে সময়মতো সিদ্ধান্ত এলে ভেনামি চিংড়ি হতে পারে দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম বড় উৎস।