
নিউজ ডেক্স , আমার সকাল ২৪
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—এই মানবিক চেতনার দীপ্ত মন্ত্রকে ধারণ করে পুরোনো জীর্ণতা ঝেড়ে নতুনের আহ্বানে রাজধানীর রমনা বটমূলে উদযাপিত হলো ছায়ানটের বর্ষবরণ ১৪৩৩। ভোরের স্নিগ্ধ আলো, মৃদুমন্দ বাতাস আর সুরের মূর্ছনায় নতুন বছরকে বরণ করে নেন শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও হাজারো দর্শক-শ্রোতা।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সূর্য ওঠার আগেই উৎসবের আবহে জেগে ওঠে রমনা। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘জাগো আলোক-লগনে’ সম্মেলক গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সমস্বরে গেয়ে তোলেন জাগরণ, প্রকৃতি ও আলোর বন্দনা—যেন নতুন দিনের প্রত্যয়ের ঘোষণা।
এবারের আয়োজন জুড়ে ছিল এক সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক বয়ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং লালন সাঁই—এই চার ধারার গান ও কবিতার মেলবন্ধনে সাজানো হয় পুরো পরিবেশনা। শুদ্ধ সুর ও কথার আবেশে তৈরি হয় এক অনন্য নান্দনিক পরিবেশ।
একক পরিবেশনায় মাকছুরা আখতার অন্তরা গেয়ে শোনান ‘এ কী সুগন্ধ হিল্লোল বহিল’। আজিজুর রহমান তুহিন পরিবেশন করেন ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো’, আর সেমন্তী মঞ্জরীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘বাজাও আমারে বাজাও’। নজরুল সংগীতের পর্বে বিটু কুমার শীল গেয়ে শোনান ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’। পাশাপাশি খায়রুল আনাম শাকিল পরিবেশন করেন ‘স্নিগ্ধ শ্যাম কল্যাণ রূপে’ এবং শারমিন সাথী ইসলাম ময়না গেয়ে শোনান ‘তোমার আমার এই বিরহ’।
আবৃত্তির মঞ্চও ছিল সমান প্রাণবন্ত। বরেণ্য আবৃত্তিকার ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও খায়রুল আলম সবুজ তাঁদের কণ্ঠে মুগ্ধ করেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের। সলিল চৌধুরীর বিখ্যাত কবিতা ‘এক গুচ্ছ চাবি’ পাঠ করেন সবুজ, যা শ্রোতাদের ভাবনার গভীরে নাড়া দেয়।
লোকজ ধারার পরিবেশনায় চন্দনা মজুমদার গেয়ে শোনান লালন সাঁইয়ের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’। বড় ও ছোটদের পৃথক এবং যৌথ পরিবেশনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। সলিল চৌধুরীর ‘পথে এবার নামো সাথী’ ও ‘সেদিন আর কত দূরে’ গানে ছিল সমবেত কণ্ঠের দৃঢ় উচ্চারণ, আর শিশুদের কণ্ঠে ‘ডিম পাড়ে হাসে’ যোগ করে এক প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস।
সবশেষে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলীর সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে মূল আয়োজনের ইতি ঘটে। তাঁর কথায় উঠে আসে মানবতা, সম্প্রীতি ও সাহসের বার্তা। এরপর উপস্থিত সবাই একসঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় বর্ষবরণের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে রমনা বটমূল যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—সংস্কৃতির আলোই পারে ভয়কে দূরে সরিয়ে মানুষের ভিতরে জাগিয়ে তুলতে মুক্ত ও উদার চিত্তের সাহস।