২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ: জিপিওর সহকারী পোস্টমাস্টারের ৫ বছরের কারাদণ্ড
- আপলোডের সময় : Friday, August 7, 2026,

২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ: জিপিওর সহকারী পোস্টমাস্টারের ৫ বছরের কারাদণ্ড
চট্টগ্রাম জেনারেল পোস্ট অফিসের (জিপিও) সঞ্চয় শাখায় ভুয়া জমা, বদলা পাসবই এবং লেজারের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা গায়েব করে ২৯ কোটি ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলায় সঞ্চয় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পোস্টমাস্টার নূর মোহাম্মদকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আত্মসাৎকৃত পুরো অর্থ অর্থদণ্ড হিসেবে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে একই মামলার অপর চার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আত্মসাতে ইচ্ছাকৃত সহযোগিতার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কবির হোসাইন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ে আদালত বলেন, এটি কোনো সাধারণ হিসাবগত ভুল নয়; বরং ভুয়া জমা, ভুয়া হিসাব, বদলা পাসবই ব্যবহার, লেজারের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা অপসারণ, প্রকৃত আমানতকারীর অজ্ঞাতে হিসাব পরিচালনা এবং সরকারি ছুটির দিনেও লেনদেন দেখানোর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জিপিওর সঞ্চয় শাখার বিভিন্ন সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব ব্যবহার করে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
কীভাবে ধরা পড়ে জালিয়াতি
২০২০ সালের ২৬ আগস্ট আকস্মিক পরিদর্শনে প্রথমে তিনটি হিসাবে ৪৫ লাখ টাকার অসংগতি ধরা পড়ে। পরে বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকের অনুসন্ধানে আত্মসাতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ কোটি ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকা।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক শহীদুল ইসলাম মোড়ল মামলা করেন। তদন্ত শেষে নূর মোহাম্মদসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
নূর মোহাম্মদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত
আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, নূর মোহাম্মদ সঞ্চয় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পোস্টমাস্টার হিসেবে হিসাব যাচাই, লেনদেন অনুমোদন, লেজার নিয়ন্ত্রণ এবং বদলা পাসবই অনুমোদনের দায়িত্বে ছিলেন।
সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দ করা লেজার, পাসবই, উত্তোলন ফরম, দৈনিক জার্নাল, সিডিউল এবং বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে কয়েকটি হিসাবে লেজারের ১৯৯ ও ২০০ নম্বর পৃষ্ঠা গায়েব, ভুয়া জমা, অতিরিক্ত উত্তোলন, বদলা পাসবই ব্যবহার এবং প্রকৃত আমানতকারীর অজ্ঞাতে লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
আকস্মিক পরিদর্শনের পর নূর মোহাম্মদের ব্যবহৃত ড্রয়ার, টেবিলের নিচ এবং শাখার বাথরুমের সানশেড থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। আদালত বলেন, জব্দ করা দলিল, হিসাবের অসংগতি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং উদ্ধার হওয়া অর্থ মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে একটি অবিচ্ছিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রমাণশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তদন্তের সীমাবদ্ধতা
আদালত উল্লেখ করেন, তদন্তে হস্তলেখা বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়নি, যা তদন্তের একটি সীমাবদ্ধতা। তবে কেবল এ কারণে অন্যান্য প্রত্যক্ষ, দলিলগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে অগ্রাহ্য করা যায় না। দীর্ঘদিন অডিটে অনিয়ম ধরা না পড়লেও তা অপরাধ সংঘটিত হয়নি—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে না বলেও পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।
চার কর্মকর্তা খালাস
অন্যদিকে, ২ থেকে ৫ নম্বর আসামির বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট জাল দলিল, নির্দিষ্ট লেনদেন কিংবা আত্মসাতে ইচ্ছাকৃত সহযোগিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি প্রসিকিউশন।
আদালত বলেন, দায়িত্বে অবহেলা বা প্রশাসনিক গাফিলতি শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয় হতে পারে; কিন্তু তা ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। ‘সন্দেহ যত প্রবলই হোক, তা প্রমাণের বিকল্প নয়’—এই নীতির ভিত্তিতে পোস্টাল অপারেটর সরওয়ার আলম খান, জয়নাল আবেদীন, কবির আহমেদ ও মো. হাসানকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থদণ্ডও বহাল
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর জানান, নূর মোহাম্মদকে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১/৪৭৭-ক ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(2) ধারায় এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সব সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে আত্মসাতকৃত ২৯ কোটি ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় নূর মোহাম্মদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জব্দকৃত আলামত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।









