সংকট সমাধানের ভার্সিটিই সংকটে
- আপলোডের সময় : Monday, August 24, 2026,

সংকট সমাধানের ভার্সিটিই সংকটে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সাত কলেজের দীর্ঘদিনের সংকট সমাধান ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ডিসিইউ)। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হলেও প্রতিষ্ঠার পরই দেখা দিয়েছে নানা সংকট। প্রশাসনিক কাঠামো, একাডেমিক কার্যক্রম, মাইগ্রেশন, পরীক্ষা ও স্থায়ী ক্যাম্পাস—সবকিছু নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এসব সংকট দ্রুত সমাধানের দাবিতে রোববার ঢাকা কলেজের শহীদ মিনারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা ১৩ দফা দাবি জানায়।
২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীরা নানা একাডেমিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন তারা। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ডিসিইউ প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি হয় এবং ১০ এপ্রিল তা সংসদে পাস হয়।
তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। এখনো পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি হয়নি। সাত কলেজে প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা মডারেটর নিয়োগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এরই মধ্যে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও আগের ব্যাচের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা কবে ও কীভাবে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। ফলে সেশনজটের আশঙ্কা বাড়ছে।
মাইগ্রেশন নিয়ে বিভক্ত শিক্ষার্থীরা
বর্তমান শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাকি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করবেন—এ নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। একাংশ ঢাবির সনদ চান। তাদের যুক্তি, ঢাবির অধীনে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পর নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইগ্রেশন করলে সনদের গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ডিসিইউতে মাইগ্রেশনের পক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের দাবি, স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করলে অধিভুক্তির পরিচয় ছাড়াই সনদ পাওয়া যাবে, সময়মতো পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র পরিচয় পাবেন।
সম্প্রতি অনলাইনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ডিসিইউতে মাইগ্রেশনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ডিসিইউতে মাইগ্রেশনের পক্ষে থাকা ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আলিফা আরা মিম বলেন, স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলে শিক্ষার্থীরা অধিভুক্ত লেখা ছাড়া সনদ, সময়মতো পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে ঢাবির অধীনে শিক্ষাজীবন শেষ করতে চাওয়া শিক্ষার্থী নূরে তামান্না তাসফিয়া বলেন, কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাইগ্রেশন করা উচিত নয়। তার মতে, ঢাবির অধীনে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করার পর ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
বাড়ছে সেশনজটের আশঙ্কা
সেশনজট কমানোর লক্ষ্যেই ডিসিইউ প্রতিষ্ঠা করা হলেও এখন উল্টো সেশনজটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ তাদের শিক্ষাজীবনের প্রায় ১৪-১৫ মাস পার হয়ে গেছে। কবে পরীক্ষা হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ঢাবির সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম বর্ষের পরীক্ষা আগস্টে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডিসিইউর পক্ষে তা সম্ভবত অক্টোবরের আগে নেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে পরীক্ষা দুই মাস পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী পরীক্ষাগুলোও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থায়ী ক্যাম্পাসও অনিশ্চিত
ডিসিইউর ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ হলেও অধিকাংশ পদ এখনো ফাঁকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় হবে, সেটিও চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে বারিধারা ডিওএইচএসের একটি ভাড়া ভবন থেকে অস্থায়ীভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া এখনো একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট গঠন হয়নি। ফলে ভর্তি, মাইগ্রেশন, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাত কলেজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহফিল আরা বেগম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট গঠন করে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আইন অনুযায়ী বিষয়গুলো পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভিসির বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে ডিসিইউর ভিসি মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান শিক্ষার্থীরা ঢাবি থেকে ডিসিইউতে থাকতে চান কি না, সে বিষয়ে মতামত নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছে এবং তারা ক্লাস, পরীক্ষা ও পরীক্ষা কমিটির দায়িত্ব পালন করবেন। বাকি সমস্যাগুলোও সমাধানের চেষ্টা চলছে।
১৩ দফা দাবি
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ, একাডেমিক অধিকার নিশ্চিত করা, ডিজিটাল লার্নিং রিসোর্স ও ই-জার্নালে সমান সুযোগ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন, গবেষণার পরিবেশ ও গবেষণা তহবিল নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া বাস্তবসম্মত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ, সময়মতো ক্লাস-পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ, পরীক্ষার কাঠামো স্পষ্ট করা, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগোপযোগী নতুন বিষয় চালু এবং দ্রুত টিএসসি নির্মাণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের মতে, দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানের লক্ষ্যেই তারা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তুলেছিলেন। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও যদি পরীক্ষা, ফল, মাইগ্রেশন ও একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেই সংকটের সমাধান কতটা হলো—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।