শিবচরে জেলে পরিচয়ে সুবিধা নিচ্ছেন ভিন্ন পেশার মানুষ
- আপলোডের সময় : Thursday, September 10, 2026,

শিবচরে জেলে পরিচয়ে সুবিধা নিচ্ছেন ভিন্ন পেশার মানুষ
ঝুমুরী আক্তার
মাদারীপুর প্রতিনিধি, আমার সকাল ২৪
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই তালিকায় প্রকৃত জেলের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার মানুষও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ফলে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক প্রকৃত জেলে সরকারি তালিকার বাইরে থাকায় খাদ্যসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকাভুক্ত অনেক ব্যক্তি জীবনে কখনো মাছ শিকার করেননি, এমনকি নিয়মিত নদীপাড়েও যান না। তাদের প্রধান পেশা ব্যবসা, কৃষিকাজ, শ্রমিক কিংবা অন্যান্য পেশা হলেও জেলে কার্ড রয়েছে। ওই কার্ডের মাধ্যমে তারা প্রতিবছর জেলে হিসেবে খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিবচরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে শিবচর পৌরসভায় ২৯৯ জন এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের মধ্যে বন্দরখোলায় ৬৭২, সন্ন্যাসীরচরে ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণে ৩৪৫, চরজানাজাতে ৯৫১, কাঁঠালবাড়িতে ৪২১, মাদবরের চরে ২৮৭, বহেরাতলা উত্তরে ৮৯, ভান্ডারীকান্দিতে ২২০, বাঁশকান্দিতে ৫৬৪, নিলখীতে ৪৮৮, শিরুয়াইলে ৩৫৩, দত্তপাড়ায় ৪৩২, কাদিরপুরে ২৮৫, কুতুবপুরে ১৯৬, পাঁচ্চরে ১৫৪, দ্বিতীয়খণ্ডে ১৬৩, উমেদপুরে ১৬৬ এবং ভদ্রাসনে ২৭৬ জনকে প্রকৃত জেলে হিসেবে শনাক্ত করে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উপজেলা মৎস্য কার্যালয় জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে। এ বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও রয়েছে। তবে মৎস্য কার্যালয়ের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেই জেলেদের নিবন্ধন করা হয়েছে। তালিকাটি পুনরায় হালনাগাদ করা হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক পুরুষ ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন অনেক প্রকৃত জেলেরই জেলে কার্ড নেই। ফলে তারা সরকারি খাদ্য সহায়তাও পান না। বিপরীতে মাছ শিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালক ও স্বচ্ছল ব্যক্তিদের কেউ কেউ তালিকাভুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
জেলেদের দাবি, তালিকায় কয়েক হাজার ভুয়া জেলের নাম রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক শত প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে রয়েছেন।
সরেজমিনে চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খা, ইলিয়াস বেপারী, বাচ্চু মোড়লসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার কয়েকজন তালিকাভুক্ত জেলের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, তালিকাভুক্ত এসব ব্যক্তির অনেকেই পেশাদার মৎস্যজীবী নন। একই এলাকার আয়না খা ও মালেক ফকিরসহ কয়েকজনের বাড়িতে গিয়ে তাদের কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তারাও জেলে হিসেবে খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন।
পদ্মা নদীতে মাছ শিকারের সময় চরজানাজাত ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খোকন হাওলাদার ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বজলু খার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, তাদের কয়েক পুরুষ ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাদের কিংবা পরিবারের কারও জেলে কার্ড নেই। ফলে তারা কোনো সরকারি সহায়তাও পান না।
তাদের অভিযোগ, জেলে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হলে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ঘনিষ্ঠ হতে হয়। তা না হলে জেলে কার্ড পাওয়া কঠিন।
স্থানীয় একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, তারা সারা বছর নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকেন। কখন তালিকা তৈরি বা হালনাগাদ করা হয়, অনেক সময় তারা সেটিও জানতে পারেন না। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে তদবির করার সুযোগও তাদের নেই। ফলে প্রকৃত জেলেদের একটি অংশ তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
তাদের আরও অভিযোগ, ভুয়া জেলেদের কারণে সরকারি খাদ্য সহায়তা বিতরণেও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত জেলেরা অর্থ দিতে অপারগ থাকায় প্রভাবশালী বা সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জেলেদের তালিকা নিয়ে কথা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর শিবচর উপজেলা সভাপতি আবুল খায়ের খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, শিবচর উপজেলায় অতীতে সঠিকভাবে জেলেদের তালিকা তৈরি করা হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে তালিকা তৈরি করায় বিভিন্ন পেশার মানুষ ও স্বচ্ছল ব্যক্তিও জেলে হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জেলে তালিকায় কোনো অপ্রকৃত জেলের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে এবং এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সেই নাম বাদ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইলিশ আহরণ ও মৎস্য পেশার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রকৃত জেলেদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, জাল যার, তিনিই প্রকৃত জেলে। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার ব্যক্তির জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা পুনঃযাচাই করা হবে। প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং অন্য পেশার কেউ তালিকায় থাকলে তাদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।