শখের বাগান থেকে লাখ টাকা আয়, রাখির ‘প্লান্টোলজি’তে হাজার প্রজাতির গাছ
- আপলোডের সময় : Tuesday, August 25, 2026,

শখের বাগান থেকে লাখ টাকা আয়, রাখির ‘প্লান্টোলজি’তে হাজার প্রজাতির গাছ
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ী গ্রামের উদ্যোক্তা আতিফা নাসরিন রাখি। ছোটবেলা থেকেই ফুল ও গাছের প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। বাড়ির আঙিনায় শখ করে গাছ লাগানো দিয়ে শুরু হলেও সেই শখই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে সম্ভাবনাময় নার্সারি ব্যবসায়। বর্তমানে তার ‘প্লান্টোলজি’ নার্সারিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় এক হাজার প্রজাতির গাছ। এসব গাছের চারা বিক্রি করে মাসে প্রায় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন তিনি।
রাখির নার্সারিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট, ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া, অ্যালোভেরা, আগলোনেমা, কোলিয়াস, ট্রেডেস্কান্টিয়া, মনস্টেরা, ফিলোডেনড্রন, মানিপ্ল্যান্ট, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, অর্কিডসহ নানা ধরনের ফুল, পাতাবাহার ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। পাশাপাশি রয়েছে জেড প্ল্যান্ট, ইকেভেরিয়া ও হাওর্থিয়াসহ বিভিন্ন জাতের সাকুলেন্ট এবং বৈচিত্র্যময় আকৃতি ও রঙের ক্যাকটাস।
রাখি জানান, ২০২০ সালে ঘর সাজানোর জন্য শখ করে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে দুই জোড়া ক্যাকটাসের চারা কিনেছিলেন তিনি। পরে অনলাইনে বিভিন্ন নার্সারির পেজ ও গাছের ছবি দেখে গাছের ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে গাছ সংগ্রহ, চারা উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে গাছের সংখ্যা। একপর্যায়ে গড়ে তোলেন ‘প্লান্টোলজি’ নামে নিজের নার্সারি।
নার্সারিজুড়ে বিভিন্ন আকারের টব ও ঝুলন্ত পাত্রে সাজানো রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। ছাউনি ও মাচার নিচে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া ও বিভিন্ন পাতাবাহার। রঙিন পাতার আগলোনেমা, কোলিয়াস, মনস্টেরা ও ফিলোডেনড্রনও নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। সব মিলিয়ে নার্সারিটি পরিণত হয়েছে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায়।
শুধু নার্সারিতে নয়, অনলাইনেও গাছের চারা বিক্রি করেন রাখি। ‘প্লান্টোলজি’ নামে তার একটি অনলাইন পেজ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছের ছবি ও ভিডিও দেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগানপ্রেমীরা অর্ডার করেন। পরে তাদের কাছে গাছের চারা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নার্সারি থেকেও সরাসরি চারা বিক্রি করা হয়।
নিজের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতেও অংশ নিচ্ছেন রাখি। রংপুরের সর্বশেষ বাণিজ্য মেলায় দুটি স্টল নিয়ে অংশ নেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও চারা প্রদর্শন ও বিক্রি করেন। দর্শনার্থী ও বাগানপ্রেমীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি আশানুরূপ বিক্রিও হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাখি বলেন, ‘শুরুতে শুধুই শখ ছিল। নিজের জন্য কয়েকটি ফুলের গাছ লাগিয়েছিলাম। পরে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানুষ গাছ কিনতে চাইলে চারা তৈরি করে বিক্রি শুরু করি। এখন এটি আমার ভালো লাগার পাশাপাশি আয়েরও একটি বড় উৎস।’
নার্সারি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতার কথাও জানান রাখি। তার স্বামী শাকিল খান ও শাশুড়ি সাজেদা বেগম শুরু থেকেই তাকে সহযোগিতা করেছেন। প্রথম দিকে একাই নার্সারির কাজ করলেও বর্তমানে দুই থেকে তিনজন কর্মচারী নিয়মিত তার সঙ্গে কাজ করছেন।
বর্তমানে তার নার্সারিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রয়েছে বলে জানান রাখি। গাছের পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ থাকে। বিক্রির পরিমাণ ভালো হলে মাসিক আয় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।
তিনি বলেন, গাছের ব্যবসায় সফল হতে হলে ধৈর্য ও নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই। প্রতিটি গাছের জন্য আলাদা পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। কোন গাছে কতটুকু পানি, কী ধরনের মাটি ও সার প্রয়োজন—এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। পাশাপাশি গাছের রোগবালাই শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।
রাখির মতে, সামান্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে অল্প জায়গায় বাড়ির আঙিনা, ছাদ কিংবা পতিত জমিতেও নার্সারি করা সম্ভব। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারলে এটি বাড়তি আয়ের ভালো উৎস হতে পারে। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।
নার্সারিটি পরিদর্শন করে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না রাখির উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শখকে কাজে লাগিয়ে আতিফা নাসরিন একটি সম্ভাবনাময় নার্সারি গড়ে তুলেছেন। তার নার্সারিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রয়েছে, যা এলাকার মানুষের মধ্যে বাগান করার আগ্রহও তৈরি করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ফুল ও শোভাবর্ধক গাছের নার্সারি গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাত্র এক হাজার টাকার ক্যাকটাস দিয়ে শুরু করা রাখির উদ্যোগ এখন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার গাছের সংগ্রহে পরিণত হয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রায় এক হাজার প্রজাতির গাছের চারা সংগ্রহ, উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে ‘প্লান্টোলজি’ এখন তার শখের পাশাপাশি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।