রাবিতে ‘শিবিরের স্পাই’ সন্দেহে শিক্ষার্থীকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তার অভিযোগ
- আপলোডের সময় : Tuesday, September 15, 2026,

রাবিতে ‘শিবিরের স্পাই’ সন্দেহে শিক্ষার্থীকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলে শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ছাত্রদলে প্রবেশের চেষ্টা করার সন্দেহে এক শিক্ষার্থীকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে মারধর ও বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা। তার দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই শিক্ষার্থীর মোবাইলে শিবিরের এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায় এবং পরে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের গেস্টরুমে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারী গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আসিফ বলেন, পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি হলে একটি সিটের জন্য প্রভোস্টের কাছে কয়েকবার আবেদন করেছিলেন। পরে গণরুমে ফাঁকা সিটের বিষয়ে জানতে গেলে তাকে হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ফুয়াদের সঙ্গে কথা বললে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হলে সিট দেওয়া হবে বলে তাকে জানানো হয়। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে তিনি ছাত্রদলের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাজি হন বলে দাবি করেন।
আসিফের অভিযোগ, পরে রাতে ফুয়াদের কক্ষে গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তার মোবাইল ফোন নেওয়া হয়। এরপর মোবাইলের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে তাকে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ করা হয়। তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলে তাকে ধমক দেওয়া হয়। পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে আসেন এবং তাকে গণরুমে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় জোহা হলের সেক্রেটারি সবুজ আহমেদও তাকে মারধর করেন বলে দাবি করেন আসিফ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মারধরের পরও তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং শিবিরের ‘স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাকে মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না এবং পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো কথাও বলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ এবং তাকে দিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য বলানো ও লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন আসিফ।
আসিফ বলেন, এসব ঘটনায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জোহা হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ বলেন, ওই শিক্ষার্থীকে তিনি আগে থেকে তেমন চিনতেন না। রাকসু নির্বাচনের সময় এক-দুবার মোবাইলে কথা হয়েছিল। কয়েক দিন আগে প্রভোস্টের রুমের সামনে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানান, প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে ছিলেন এবং তার সিট নতুন করে বরাদ্দ হওয়ায় থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন।
ফুয়াদের দাবি, ওই শিক্ষার্থী নিজেকে বিএনপির পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তার মোবাইলের বিভিন্ন তথ্য ও নথি দেখার পর শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীকে ছাত্রদলের হল গ্রুপে যুক্ত করার জন্য তার মোবাইল হাতে নেওয়ার পর হল শিবিরের সভাপতি আব্দুর রহমান রাসানের সঙ্গে কথোপকথন দেখতে পান। সেখানে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের তথ্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া প্রভোস্টের কক্ষসহ বিভিন্ন স্থানে কথোপকথন রেকর্ড ও নজরদারির বিষয়ে নির্দেশনা থাকার তথ্যও মোবাইলে পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন ফুয়াদ।
ফুয়াদ আরও বলেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে তার কাছে মনে হয়েছে, ওই শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, একটি ভিডিওতে ওই শিক্ষার্থীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাকে মারধর করা হয়েছে কি না। সেখানে সে মারধরের কথা অস্বীকার করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে বলে দাবি করেন ফুয়াদ।
জোহা হল শাখা শিবিরের সভাপতি আব্দুর রহমান রাসান বলেন, আসিফের সঙ্গে হল শাখা শিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে তার সঙ্গে পরিচয় ছিল। হলের আবাসিকতার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা তার কাছে এলে তিনি তাদের নিয়ম অনুযায়ী প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
ফুয়াদের সঙ্গে আসিফের কথোপকথন রেকর্ড করার বিষয়ে কোনো স্ক্রিনশটের প্রসঙ্গ এলে রাসান বলেন, প্রকাশিত স্ক্রিনশটে শুধু কথোপকথনের একটি অংশ রয়েছে। পুরো কথোপকথনের আগের ও পরের অংশ প্রকাশ করা হলে কেন রেকর্ড করতে বলা হয়েছিল, তা স্পষ্ট হবে বলে দাবি করেন তিনি।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ওই শিক্ষার্থী হল সভাপতির কক্ষে যাওয়ার পর বিষয়টি তাকে জানানো হলে তিনি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটানোর নির্দেশ দেন। যত রাতই হোক, শিক্ষার্থীকে হল প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। অন্যায়ের বিচার করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, ছাত্রদলের নয় বলেও জানান রাহী।
অন্যদিকে, রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তার দাবি, হলে ওই শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি এখনো বিষয়টি বিস্তারিত জানেন না। ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। প্রকৃত ঘটনা জেনে পরে বক্তব্য দিতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, ঘটনা সম্পর্কে তারা শুনেছেন। প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।