মাতামুহুরী উপজেলা হবে মফস্বলের মানুষের এক স্বপ্নের উপশহর
- আপলোডের সময় : Tuesday, September 1, 2026,

মাতামুহুরী উপজেলা হবে মফস্বলের মানুষের এক স্বপ্নের উপশহর
আল নাহিয়ান আবিদ
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। মাতামুহুরী নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ জনপদ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে আসছে। নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মাতামুহুরী একটি পরিকল্পিত ও সম্ভাবনাময় উপশহরে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
বদরখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, সাহারবিল, ভেওলা মানিকচর, ঢেমুশিয়া ও কোনাখালী—এই সাত ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাতামুহুরী কক্সবাজার জেলার নতুন প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় এ উপজেলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে চকরিয়ার উপকূলীয় সাত ইউনিয়নকে নিয়ে পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ মাতামুহুরীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার প্রতিশ্রুতি দেন বলে স্থানীয়রা জানান। নির্বাচনের পর প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে যায় এবং ১৩ জুন ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপজেলা ও থানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নদীর নামেই উপজেলার নাম
মাতামুহুরী নদীকে কেন্দ্র করেই এ উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। নদীটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিবিড়ভাবে জড়িত।
ব্রিটিশ আমলে, আনুমানিক ১৮৮০ সালের দিকে, নদীর অববাহিকায় মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করা হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশাল বনাঞ্চল থেকে কাঠ ও বাঁশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেও একসময় এ নদী ব্যবহৃত হতো। নদী ও বনকে ঘিরে শত শত মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছিল।
প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায়
নতুন উপজেলা গঠনের বিষয়ে পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ারুল আরিফ দুলাল মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা প্রতিষ্ঠাকে তিনি মানুষের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ চকরিয়া উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক সেবা নিতে দূরত্ব ও সময়ের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। নতুন মাতামুহুরী উপজেলা সেই সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।
তবে শুধু উপজেলা ঘোষণা করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কার্যকর সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এসব বাস্তবায়ন হলেই উপজেলা প্রতিষ্ঠার কাঙ্ক্ষিত সুফল জনগণ পাবে।
জনদাবির সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্যোগও ছিল
মাতামুহুরী উপজেলা প্রতিষ্ঠার পেছনে জনদাবি ও রাজনৈতিক বিবেচনা—দুটিই ছিল বলে মনে করেন আনোয়ারুল আরিফ দুলাল মিয়া।
তার ভাষ্য, স্থানীয় গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মাতামুহুরী উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, জনসংখ্যা ও মানুষের নাগরিক চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, মাতামুহুরী উপজেলা প্রতিষ্ঠা অত্রাঞ্চলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, চকরিয়া-পেকুয়া আসনের একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ছিল।
শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা
ভেওলা মানিকচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ভেওলা মানিকচর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক রোকন উদ্দিন মো. বাবর মনে করেন, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে প্রশাসনিক সেবার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, মাতামুহুরী অঞ্চল একদিকে মাতামুহুরী নদীর মিষ্টি পানির উৎস এবং অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। এখানকার মানুষের বড় অংশ কৃষি, মৎস্য ও লবণ চাষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পেশাগত বৈচিত্র্যের অভাব এবং বিভিন্ন সেবা থেকে দূরত্বের কারণে দীর্ঘদিন তারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে প্রশাসনিক ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তিনি শুধু প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতামুহুরীতে একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নতমানের হাসপাতাল এবং লবণ শিল্পের আধুনিকায়নের দাবি জানান।
নদীকে ঘিরে হতে পারে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র
মাতামুহুরী নদীকে ঘিরে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ, বাজারব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সমন্বিত উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। নদীর পানি ও সংযুক্ত ভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
একই সঙ্গে পরিকল্পিত নদী শাসন ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে স্থানীয় বাজারগুলো আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। কৃষি ও মৎস্যপণ্য সরাসরি বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
এভাবে মাতামুহুরী শুধু একটি প্রশাসনিক উপজেলা নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্বপ্নের উপশহর গড়ার প্রত্যাশা
নতুন উপজেলা হিসেবে মাতামুহুরীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, নদী দখল ও দূষণ, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ঘাটতি যেন ভবিষ্যতের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—সেদিকে শুরু থেকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি পরিকল্পিত সড়ক, বাজার, হাসপাতাল, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প, আধুনিক লবণ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
নদী, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা ও মানুষের সম্ভাবনাকে সমন্বিত করে পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা গেলে মাতামুহুরী একদিন মফস্বলের মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের উপশহরে পরিণত হতে পারে। নবগঠিত এই উপজেলার মানুষের প্রত্যাশা—মাতামুহুরী শুধু নামেই নতুন উপজেলা নয়, বাস্তব উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধার দিক থেকেও দেশের একটি আদর্শ জনপদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করুক।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।