মাটির ঘ্রাণে বেঁচে আছে শরীফপুর পাল পাড়ার ঐতিহ্য
- আপলোডের সময় : Sunday, August 30, 2026,

মাটির ঘ্রাণে বেঁচে আছে শরীফপুর পাল পাড়ার ঐতিহ্য
কালের বিবর্তনেও হারিয়ে যায়নি মাটির শিল্প, সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা কারিগরদের
এহিয়া আহমদ লিটন
দিরাই প্রতিনিধি
আধুনিকতার ছোঁয়া আর প্লাস্টিকের দাপটেও হারিয়ে যায়নি মাটির শিল্প। আবহমানকাল থেকে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামের পাল পাড়ায় বংশপরম্পরায় চলে আসছে মাটির তৈরি সামগ্রী উৎপাদনের ঐতিহ্য। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাল সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের এই পেশা।
এটেল মাটি সংগ্রহ করে দক্ষ হাতে কারিগররা তৈরি করেন বিভিন্ন পূজার মূর্তি, দইয়ের পাতিল, জালের গোলি, মাটির খেলনাসহ নানা ধরনের সামগ্রী। একসময় এসব মাটির পণ্য গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ও আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা অনেকটাই কমেছে।
তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শরীফপুর পাল পাড়ার কারিগররা। তাঁদের তৈরি মাটির বিভিন্ন সামগ্রী শুধু দিরাই উপজেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়; জেলার বিভিন্ন প্রান্তেও এসব পণ্য বিক্রি করেন তাঁরা।
বিশেষ করে শীত ও বসন্ত মৌসুমে বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় মাটির খেলনাসহ নানা সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেন পাল পাড়ার কুটির শিল্পীরা। মেলায় শিশুদের কাছেও মাটির তৈরি খেলনার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।
সম্প্রতি শরীফপুর পাল পাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে। তাঁরা জানান, মাটির কাজ তাঁদের কাছে শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি তাঁদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য এবং বংশপরম্পরার পেশা।
পাল পাড়ার কারিগর নিতেশ পাল বলেন, মাটির মূর্তি তৈরি করে কিছুটা লাভবান হওয়া গেলেও খেলনাজাতীয় পণ্য তৈরিতে খুব বেশি মুনাফা হয় না। তারপরও ঐতিহ্যের টানে তাঁরা কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “এটা আমাদের ঐতিহ্য, জাতিগত ব্যবসা। একসময় আমরা বিনামূল্যে মাটি পেতাম। এখন মাটি কিনে আনতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে আগের মতো লাভ থাকে না।”
কারিগর বিপ্লব পাল জানান, তিনি মূলত জালের গোলি তৈরি করে বিক্রি করেন এবং এতে তুলনামূলক ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। তবে পাল পাড়ার মাটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের আরও উৎসাহিত করতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমরা যদি সরকারি সহযোগিতা পেতাম, তাহলে পাল পাড়ার মাটির কাজ করা মানুষগুলো আরও উৎসাহিত হতো। এই কাজকে আরও বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব হতো।”
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটি সংগ্রহ, পণ্য তৈরির ব্যয়, বাজারজাতকরণ ও ন্যায্য মূল্য পাওয়া—সব মিলিয়ে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার উন্নতি হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শরীফপুর পাল পাড়ার মাটির শিল্প শুধু একটি পেশা নয়; এটি দিরাইয়ের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার চাপে দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃৎশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এ ধরনের কুটির শিল্প টিকিয়ে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শরীফপুর পাল পাড়ার কারিগরদের প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হলে মাটির এই শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।
বংশপরম্পরায় চলে আসা মাটির ঘ্রাণে মিশে থাকা এই ঐতিহ্য টিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের হাতেও—এমনটাই প্রত্যাশা পাল পাড়ার কারিগরদের।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।