পিরোজপুরে চরম সংকটে ৪-৫ হাজার পোল্ট্রি খামারি, ধ্বংসের মুখে শিল্প
- আপলোডের সময় : Thursday, August 27, 2026,

পিরোজপুরে চরম সংকটে ৪-৫ হাজার পোল্ট্রি খামারি, ধ্বংসের মুখে শিল্প
পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি
পিরোজপুরে মুরগির খাবার, ওষুধ-ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিমের বাজারদরের অস্থিরতায় চরম সংকটে পড়েছেন পোল্ট্রি খামারিরা। এর সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় অনেক প্রান্তিক খামারি উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। ফলে প্রতিটি ডিমে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুর সদরসহ জেলার সাত উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামারে বছরে প্রায় ৪২ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। জেলার নেছারাবাদ ও নাজিরপুর উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাণিজ্যিক মুরগির খামার গড়ে উঠেছে।
পোল্ট্রি খামারি হারুন বলেন, ডিমের উৎপাদন থাকলেও খামারিরা স্বস্তিতে নেই। খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডিমের বাজারদর ওঠানামা করায় প্রতিনিয়ত লোকসানের আশঙ্কায় থাকতে হচ্ছে।
খামারিরা জানান, একটি মুরগিকে ডিম উৎপাদনের উপযোগী করে তুলতে বাচ্চা কেনা থেকে শুরু করে খাবার, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। বর্তমানে এসব উপকরণের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
সাজিদ পোল্টির স্বত্বাধিকারী বলেন, খাবারের পাশাপাশি ওষুধ ও ভ্যাকসিনের দামও বেড়েছে। এ অবস্থায় খামারিদের টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডিমের দাম আরও কমে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাকিতে উপকরণ কিনে বিপাকে খামারিরা
পোল্ট্রি ব্যবসার আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাকিতে বাচ্চা, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ কেনা। অনেক খামারি পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে এসব উপকরণ নেন। পরে উৎপাদিত ডিম বিক্রির সময় নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তারা।
এক খামারি বলেন, “আমরা অনেক সময় বাকিতে বাচ্চা ও ওষুধ নিই। পরে ডিম বিক্রির সময় তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজের মতো করে বাজারজাত করার সুযোগ সবসময় থাকে না।”
খামারিদের অভিযোগ, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে ডিমের বাজারদর নির্ধারণ করা হয়। এতে উৎপাদকদের স্বার্থ সবসময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
তবে ডিম ও পোল্ট্রি ব্যবসায়ী মিজান বলেন, “আমরা নিজেরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করি না। বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, ডিম নষ্ট হওয়া, পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ব্যবসায়ী সমিতি ডিমের দাম নির্ধারণ করে।”
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক স্তর থাকায় প্রকৃত বাজারদরের সুফল অনেক সময় খামারিরা পান না। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
আড়তদার ইকবাল হোসেন বলেন, “আমরাও বাজারদরের ওপর নির্ভর করে ডিম কিনি ও বিক্রি করি। পরিবহন, শ্রমিক, নষ্ট হওয়া ডিমসহ আমাদেরও বিভিন্ন খরচ রয়েছে। বাজারে দাম কমলে আমাদেরও ক্ষতি হয়।”
এদিকে খামারগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শ্রমিকদের আয়-রোজগারও নির্ভর করছে পোল্ট্রি শিল্পের টিকে থাকার ওপর। এক শ্রমিক বলেন, “প্রতিদিন ভোর থেকে কাজ করতে হয়। খামারি লোকসানে পড়লে আমাদের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। আমরা চাই সরকার উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের মধ্যে সমন্বয় করুক।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার শিকদার বলেন, পিরোজপুরের পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে শুধু খামারি নন, শ্রমিক, ওষুধ ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার ও ডিম ব্যবসায়ীরাও জড়িত। আয়-ব্যয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও ডিমের বাজারদরের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে অনেক খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পোল্ট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের দাম নির্ধারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।









