ধূসর হলো রক্তিম আভা, ভেঙে পড়ল রাবির বর্ষীয়সী কৃষ্ণচূড়া
- আপলোডের সময় : Tuesday, August 25, 2026,

ধূসর হলো রক্তিম আভা, ভেঙে পড়ল রাবির বর্ষীয়সী কৃষ্ণচূড়া
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে রঙিন ফুল, বিস্তৃত ডালপালা আর তীব্র রৌদ্রে স্বস্তির ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বর্ষীয়সী এক কৃষ্ণচূড়া। বহু বছরের স্মৃতি আর ইতিহাসের সাক্ষী সেই গাছটি এখন আর দাঁড়িয়ে নেই। ছত্রাক, উইপোকা ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে সোমবার (২৪ আগস্ট) মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে গাছটি।
সোমবার বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটসংলগ্ন সত্যেন্দ্রনাথ বসু অ্যাকাডেমিক প্রথম বিজ্ঞান ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পড়ে থাকা বিশাল কাণ্ড ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডালপালা দেখে বোঝা যায়, একসময় কতটা বিস্তৃত ও রাজকীয় ছিল গাছটির অবয়ব।
সরেজমিনে দেখা যায়, গাছটির গোড়া ও কাণ্ডের বিভিন্ন অংশে পোকার আক্রমণের চিহ্ন রয়েছে। কাণ্ডের ভেতরের বড় অংশ ফাঁপা হয়ে গেছে। ছত্রাক, উইপোকা ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার দীর্ঘদিনের আক্রমণেই গাছটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট নিজামুদ্দিন নামের এক কর্মচারী গাছটি রোপণ করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শুরুর সময় থেকেই গাছটি সেখানে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে হাজারো শিক্ষার্থী এই গাছের নিচে বসেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, ছবি তুলেছেন। এক প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম; কিন্তু কৃষ্ণচূড়াটি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে স্বাগত জানিয়েছে। ফলে গাছটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অসংখ্য স্মৃতি।
গাছটি ভেঙে পড়ার খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীরা আবেগঘন পোস্টে স্মৃতিচারণা শুরু করেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া হক মিথি বলেন, ‘গাছটির সঙ্গে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর লাখো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পুরো ক্যাম্পাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে গাছটি একটি। সেদিক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এখন গাছটার এমন করুণ অবস্থা দেখলে সত্যিই খুব খারাপ লাগবে।’
আখতারুজ্জামান রিসাত নামের এক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে গাছটির সঙ্গে নিজের স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের সময় দূর থেকে গাছটির ফুল দেখা এবং মাঝে মাঝে ছবি তোলার স্মৃতি এখন কেবলই অতীত।
গাছটির পাশে দীর্ঘদিন ধরে খাবারের দোকান চালান মিজান। তাঁর কাছেও গাছটির পতন দীর্ঘদিনের এক পরিচিত সঙ্গীকে হারানোর মতো।
তিনি বলেন, ‘গাছটি তার ব্যবসার সঙ্গী ছিল অনেক বছর ধরে। প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীরা যখন ঘেমে-নেয়ে আসত, তখন এর নিচেই দাঁড়াতেন। কয়েক মাস ধরেই দেখছিলাম, গাছটির পাতাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ডালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে ভেতরে যে পোকা বাসা বেঁধেছে, তা বুঝতে পারিনি। সকালে যখন হুড়মুড় করে পড়ে গেল, তখন মনে হলো আপন কেউ একজন চলে গেল।’
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এ.কে.এম. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘গাছটি অনেক পুরোনো। আমার যোগদানের পর থেকেই গাছটি দেখছি। কালক্রমে এটা সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।’
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. এম. মনজুর হোসেন বলেন, ‘পুরোনো বড় গাছ একটি ক্যাম্পাসের অমূল্য পরিবেশগত সম্পদ। এসব গাছ শুধু ছায়াই দেয় না, ক্যাম্পাসের মাইক্রো-ক্লাইমেট বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পাখিদের আশ্রয়স্থল তৈরি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ.এইচ.এম. মাহবুবুর রহমান বলেন, গাছটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই লাগানো হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বয়সের কারণে সময়ের সঙ্গে এর মূল দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ওপরের অংশে শাখা-প্রশাখা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় গোড়ার পক্ষে অতিরিক্ত ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কাণ্ডে পোকামাকড়ের আক্রমণের চিহ্নও পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে। অনুকূল পরিবেশে এবং কাণ্ডে পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ শতাধিক বছর, এমনকি প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল আলম বলেন, কাণ্ডের ভেতর ফাঁপা হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে ‘হার্ট রট’ নামের ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগে গাছের কাণ্ডের ভেতরের হার্টউড ধীরে ধীরে পচে যায়। ফলে বাইরে থেকে গাছটি স্বাভাবিক ও শক্ত মনে হলেও ভেতরের কাঠ দুর্বল হয়ে পড়ে। গ্যানোডার্মা বা ফোমিটপসিস জাতীয় কাঠ-পচনকারী ছত্রাক এ ধরনের রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। পাশাপাশি উইপোকার আক্রমণও গাছের কাণ্ড দুর্বল করে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পুরোনো গাছের রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে পর্যাপ্ত বিশেষায়িত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ঐতিহ্যবাহী পুরোনো গাছের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একটি কৃষ্ণচূড়ার পতন যেন শুধু একটি গাছের পতন নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে গেল ক্যাম্পাসের একটি পরিচিত দৃশ্য ও বহু প্রজন্মের স্মৃতির ঠিকানা। শিক্ষার্থীদের আশা, একদিন এই জায়গায় নতুন কৃষ্ণচূড়া বেড়ে উঠবে, গ্রীষ্মে আবারও রক্তিম ফুলে রাঙাবে ক্যাম্পাস। তবে পুরোনো সেই গাছটি আর ফিরবে না। পড়ে থাকা কাণ্ড ও ছড়িয়ে থাকা ডালপালাই এখন তার শেষ চিহ্ন; আর তার ছায়ায় জমে থাকা গল্পগুলো থেকে যাবে শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।