দুর্গাপুর-কলমাকান্দা নিরাপদ পানির সংকট, রোগের ঝুঁকিতে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার পাহাড়ি জনপদ
- আপলোডের সময় : Monday, September 7, 2026,

দুর্গাপুর-কলমাকান্দা নিরাপদ পানির সংকট, রোগের ঝুঁকিতে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার পাহাড়ি জনপদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে ভারতের সীমান্ত। নদী আর সবুজে ঘেরা নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ছুটে এলেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের কাছে পানি যেন দুই মৌসুমের দুই দুর্ভোগ।
শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যায়। আর বর্ষায় পানি থাকলেও পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে কূপসহ স্থানীয় পানির উৎস তলিয়ে গিয়ে তা অনিরাপদ হয়ে পড়ে। এভাবেই বছরের পর বছর পানিসংকট ও নিরাপদ পানির অভাব মোকাবিলা করছেন সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা।
কলমাকান্দার লেংগুরা, খারনৈ ও রংছাতি ইউনিয়ন এবং দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ও সদর ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পানির সংকট বেশি। এসব এলাকায় গারো, হাজংসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ২১ হাজার ৬০৫ মানুষের বসবাস। দুর্গম পাহাড়ি জনপদের অনেক পরিবার এখনো কূপ, পাহাড়ি ছড়া ও অল্পসংখ্যক নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। ভূপ্রকৃতিগত কারণে এসব এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপনও সহজ নয়।
ফলে পানির উৎস থাকলেও সারা বছর মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না।
শুকিয়ে যায় ছড়া, কমে কূপের পানি
লেংগুরা, খারনৈ ও রংছাতি ইউনিয়নের কয়েকটি পাহাড়ি গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বৃষ্টি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে যায় পাহাড়ি ছড়া। কমতে থাকে কূপের পানিও। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অগভীর নলকূপেও পানি ওঠে না।
তখন খাবার পানির জন্য দূরের উৎসে ছুটতে হয়। নারী ও শিশুদের এক থেকে দেড় কিলোমিটার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। একবারে যতটুকু পানি আনা সম্ভব, তা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়াই নয়, কোথাও নলকূপে পানি মিললেও অতিরিক্ত আয়রনের কারণে তা ব্যবহারেও ভোগান্তি রয়েছে। ফলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ অনেক পরিবারের প্রতিদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।
কলমাকান্দার পাঁচগাঁও এলাকার বাসিন্দা রিনা হাজং বলেন, ‘শুকনা মৌসুমে আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় পানির জন্য। বাড়ির আশপাশের কূপ ও ছড়ার পানি শুকিয়ে যায়, নলকূপেও ঠিকমতো পানি ওঠে না। তখন খাবার পানি আনতে অনেক দূরে যেতে হয়। একবারে যতটুকু পানি আনা যায়, তাতে সংসারের প্রয়োজন মেটে না।’
বর্ষায় পানি বাড়ে, কমে নিরাপদ উৎস
শুষ্ক মৌসুমের সংকট কাটার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষায় পরিস্থিতি বদলে যায়। পাহাড়ি ছড়া পানিতে ভরে ওঠে। চারদিকে দেখা দেয় পানির আধিক্য। অনেক পরিবার বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পান ও রান্নার কাজে ব্যবহার করে।
তবে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল তখন নতুন সংকট তৈরি করে। ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় কূপ ও স্থানীয় পানির উৎস। পানির সঙ্গে মিশে যায় ময়লা-আবর্জনা, কাদা ও পলি। কোথাও ঘোলা হয়ে যায় পানি, কোথাও কূপের তলায় জমে পলি।
ফলে বর্ষায় পানির অভাব না থাকলেও নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ে। ঢলের পানি নেমে যাওয়ার পরও কয়েক দিন পর্যন্ত কূপের পানি ব্যবহার অনুপযোগী থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা দুর্গাদেবী হাজং বলেন, ‘বর্ষায় আমাদের চারপাশে পানি থাকলেও সেই পানি পান করার উপায় থাকে না। একটু বেশি বৃষ্টি হলে কূপের পানি ঢলের পানিতে ডুবে যায়। ময়লা, কাদা ও পলি মিশে পানি ঘোলা হয়ে যায়। তখন বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ঢল নেমে যাওয়ার পরও কয়েক দিন কূপের পানি ব্যবহার করা যায় না। তখন দূর থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে হয়।’
পানির সঙ্গে বাড়ে রোগের ঝুঁকি
পাহাড়ি ঢলের পর দূষিত বা অপরিষ্কার পানি ব্যবহারে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে কূপ বা স্থানীয় পানির উৎস ঢলের পানিতে তলিয়ে গেলে পানি ব্যবহারের আগে তা নিরাপদ করার প্রয়োজন পড়ে।
নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মাজহারুল আমীন বলেন, বন্যা বা অন্য কোনো কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিলে পানি ফুটিয়ে অথবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করা উচিত। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢলের পর পানির উৎস দূষিত হলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, দূষিত পানি ব্যবহারে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ‘এ’সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
নিরাপদ পানি সরবরাহে প্রকল্প
নেত্রকোনার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নায়েব আলী খান জানান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকার পানিসংকট সমাধানে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কাজ করছেন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।