উৎপাদনশীলতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকে অর্থনীতির মূল পরিকল্পনায় যুক্ত করার তাগিদ
- আপলোডের সময় : Tuesday, August 25, 2026,

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকে অর্থনীতির মূল পরিকল্পনায় যুক্ত করার তাগিদ
একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মানুষ সুস্থ থাকলে কর্মঘণ্টা বাড়ে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব শ্রমঘণ্টা নষ্ট করে এবং পরিবারের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে চাইলে স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও রোগনির্ণয়কেন্দ্রকে মানসম্মত সেবার আওতায় আনার পাশাপাশি সেবার মূল্য ও রোগীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন সুস্থ শ্রমিক, কৃষক, পোশাককর্মী, উদ্যোক্তা বা অফিসকর্মী তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মক্ষম থাকতে পারেন। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হলে উৎপাদন কমে যায়। একই সঙ্গে পরিবারের আয়ের বড় অংশ চিকিৎসায় ব্যয় হলে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে রোগীর তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসার তথ্য দ্রুত পাওয়া যাবে, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হবে। এর ফলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য খাতকে অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু চিকিৎসা হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশই অদেখা থেকে যায়।
তিনি বলেন, হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসা, রোগনির্ণয়, চিকিৎসা প্রযুক্তি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গেলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ দেশেই রাখা সম্ভব হবে।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামোর পাশাপাশি চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি ও অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিতে আঞ্চলিক বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে নীতিগত সহায়তা দিলে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না; কোন এলাকায় কী ধরনের হাসপাতাল প্রয়োজন, কত শয্যা দরকার, কী ধরনের চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন এবং কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগবে—এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানি, চিকিৎসা প্রযুক্তি, মেডিকেল শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. রুমানা হকের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক হলেও শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। বরাদ্দের অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে দারিদ্র্য কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রোগের জটিলতা কমবে এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপও কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন। আর সেই মানবসম্পদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি সুস্থ থাকা। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ হিসেবে না দেখে শ্রমশক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা সুরক্ষা, পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি কমানো এবং নতুন শিল্প ও সেবাখাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।











লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।