
আশরাফুদ্দীন আল আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি :
ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩৯ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার শাপলা চত্বরে সংঘটিত রক্তঝরা ঘটনার মধ্য দিয়ে দলটির রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে এক ভিডিও বার্তায় বিপ্লবী শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম (পীর সাহেব চরমোনাই)।
১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ বিভিন্ন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন” নামে একটি আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে মতপার্থক্য ও ভাঙনের পর চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে এটি একটি রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়।
১৯৯১ সাল থেকে দলটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। পরে ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের সময় দলটি “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ” নামে নিবন্ধিত হয় এবং হাতপাখা প্রতীক লাভ করে।
বর্তমানে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন—
আমীর: সৈয়দ রেজাউল করিম
সিনিয়র নায়েবে আমীর: সৈয়দ ফয়জুল করিম
মহাসচিব: অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব: গাজী আতাউর রহমান
প্রেসিডিয়াম সদস্য: সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী
দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিম। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকার পুরানা পল্টনের ৫৫/বি নোয়াখালী টাওয়ার (৩য় তলা)-এ অবস্থিত।
দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে রয়েছে—
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ,
ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ,
ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ,
ইসলামী আইনজীবী পরিষদ এবং জাতীয় শিক্ষক ফোরাম।
চরমোনাই পীর ঐতিহ্যগতভাবে দলের আমীর বা প্রধান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ ফজলুল করিমের চিন্তাধারার শিকড় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে যুক্ত। দেওবন্দমুখী কওমি মাদ্রাসা, উলামা ও বিপুল সংখ্যক মুরিদ-অনুসারী সারাদেশে দলটির শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি গড়ে তুলেছে।
দলের প্রধান কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—
দাওয়াহ ও সংগঠন গঠন,
জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণ,
জনগণের ঐক্য ও মানবতার সেবা,
সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার,
অর্থনৈতিক মুক্তি,
ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আসছে।
২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তৃতীয় এবং রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে চতুর্থ স্থান অর্জন করে দলটি। একই বছর রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে।
২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলটি যথাক্রমে ৩.৭০% ও ৩.৮০% ভোট পায়।
২০২২ সালে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৭.৮২% এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৭.৯% ভোট অর্জন করে।
২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৮.২৪%, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২৩.৪৪% এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২৪.৬৫% ভোট পায়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একটি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়ে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় এক রক্তঝরা ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার শাপলা চত্বরে আয়োজিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সমাবেশ ঠেকাতে পুলিশ আগের দিনই মঞ্চ ভেঙে দেয় এবং কয়েকজন কর্মীকে গ্রেফতার করে।
পরদিন মতিঝিল, দৈনিক বাংলা ও আশপাশের এলাকায় কড়া পুলিশি বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। সমবেত জনতার ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গুলিবর্ষণে বহু মানুষ আহত হন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের প্রাঙ্গণেও দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটে।
সেই রক্তঝরা দিন থেকেই শুরু হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংগ্রামী রাজনৈতিক অভিযাত্রা। প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছরে দলটি দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী পরিচিতি ও প্রভাব তৈরি করেছে।