সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে বিসিআইসি
গ্যাস সংকট, বন্ধ কারখানা এবং আর্থিক চাপ—এই তিন বড় চ্যালেঞ্জে একসময় স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। তবে নতুন নেতৃত্ব, সুপরিকল্পিত উদ্যোগ এবং ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পথে এগোচ্ছে।
১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২৭ এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত বিসিআইসি দীর্ঘদিন ধরে ইউরিয়া সার উৎপাদন, আমদানি ও বিপণনের মাধ্যমে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের কারণে বিসিআইসির বেশ কয়েকটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক চাপও বাড়ে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১৮ মে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. ফজলুর রহমান। তার নেতৃত্বে এবং শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে পুনরায় গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পর্যায়ক্রমে এসব কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।
একই সঙ্গে বিসিআইসির বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্থলে নতুন শিল্পপ্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অব্যবহৃত জমি ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে সার, কেমিক্যাল, গ্লাস, ফাইবার ও ফার্মাসিউটিক্যাল উপকরণসহ ১১টি নতুন শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়া অব্যবহৃত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক ভবন, গুদাম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘বিসিআইসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’ প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। গত নয় মাসে ৩০৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে নতুন কর্মউদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের উদ্যোগের অংশ হিসেবে শ্যামপুরে আধুনিক কেমিক্যাল গুদাম ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন ও জনবল সৃষ্টির কাজ চলছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধীরগতিতে থাকা ৩৪টি বাফার সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পেও নতুন গতি এসেছে। অধিকাংশ গুদামের জন্য জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং কয়েকটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে চলমান। এর ফলে সার সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিসিআইসি চিকিৎসা কেন্দ্র আধুনিকায়ন, অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়, ফিজিওথেরাপিস্ট ও প্যাথলজিস্ট নিয়োগ এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গৃহীত এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বিসিআইসি ভবিষ্যতে একটি আধুনিক, দক্ষ ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের শিল্পখাতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।