
সাইদুল ইসলাম, বালাগঞ্জ (সিলেট) বিশেষ প্রতিনিধি
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি শিল্পের কথা ইতিহাসের পাতায় বারবার উঠে এসেছে। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার তেঘরিয়া, চাঁনপুর, আতাসন, শ্রীনাথপুর, গৌরীপুর, মহিষাশি, লোহামোড়া প্রভৃতি গ্রামের অসংখ্য মানুষ একসময় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শীতল পাটি ছিল অনেক পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। কিন্তু শ্রমের তুলনায় বাজারমূল্যের ব্যবধান বাড়ায় অনেক কারিগর এ পেশা থেকে সরে গেলেও এখনো কিছু মানুষ শখ ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
একসময় বাড়িতে নতুন জামাই কিংবা বিশেষ অতিথি এলে শীতল পাটি বিছিয়ে বসতে দেওয়ার প্রচলন ছিল। কেউ তা করতে না পারলে লজ্জায় পড়তে হতো। ধীরে ধীরে শীতল পাটি হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কাশিপুর গ্রামের সুন্দরী বিবি (৬৬) ‘বালাগঞ্জ শীতল পাটি উৎপাদন বিপণন ও বাজারজাতকরণ সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সদস্যদের পাটি বুনন শেখান। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা-চাচিদের কাছ থেকে শীতল পাটি বুনন শেখেন। পয়সা, শাপলা, সোনাইমুড়ি, জয় পাটি, টিক্কা, সিকি, লাল গালিচা, আধুলি ও মিহি—এ ধরনের নানা নকশার পাটি তৈরি করতে দীর্ঘ সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। একটি নকশাদার পাটি তৈরি করতে কখনো মাসখানেক সময়ও লেগে যায়। মিহি পাটি এমনভাবে বোনা হতো, যার ওপর দিয়ে পিঁপড়াও সহজে হাঁটতে পারত না।
শীত মৌসুম এলেই সকালের নরম রোদে ঘরে ঘরে পাটি বুননের ধুম পড়ত। গ্রামের মানুষ শীতের সকালে পাটি বিছিয়ে রোদ পোহাতেন। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির নারীরা পাটি বুনতে জানতেন। তখন একটি পাটি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও সেই আয়েই সংসার চলত। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামাল ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় কম দামে পাটি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগায় এ শিল্পটি এখনো আগের পদ্ধতিতেই চলছে, ফলে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন। তবুও বাজারে শীতল পাটির চাহিদা রয়েছে।
হুসনারা বেগম (৩৫), সমবায় সমিতির আরেক সদস্য, বলেন—শীতল পাটি বুননের মধ্যে এক ধরনের শৈল্পিক অনুভূতি কাজ করে। বড়দের কাজ দেখে শিখেছেন তিনি। শীতল পাটির প্রধান কাঁচামাল ‘মুর্তা’ নামের এক ধরনের গুল্ম। আগে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুর্তার ঝোপ ছিল। সেখান থেকে আঁশ তৈরি করে রং দিয়ে শুকিয়ে বিশেষভাবে বোনা হতো পাটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুর্তা গাছ কমে গেছে। এখন কাঁচামাল কিনে আনতে হয়, ফলে লাভ কমে যায়।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে একটি শীতল পাটির বাজারমূল্য দেড় থেকে দুই হাজার টাকা হলেও কাঁচামাল সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কারিগর বেকার হয়ে পড়ছেন। মুর্তার চাষ বাড়ানো এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শীতল পাটি শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যুগোপযোগী সরকারি উদ্যোগ ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।