
সাইফুল ইসলাম রাজু
স্টাফ রিপোর্টার
শীতলক্ষ্যা নদীর শান্ত স্রোত আজও বয়ে চলে মুড়াপাড়ার পাশ দিয়ে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক দালান যেন নীরবে সময়ের দিকে তাকিয়ে আছে। লালচে ইট, খসে পড়া দেয়াল আর ছাদ ফুঁড়ে ওঠা আগাছা—সব মিলিয়ে মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি ধীরে ধীরে ইতিহাসের এক বিষণ্ন প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়ায় অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদারি যুগের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সবুজ-শ্যামল মুড়াপাড়া গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ একসময় ছিল ক্ষমতা, প্রভাব ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। এখন তা অবহেলা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাটোরের রাজার বিশ্বস্ত কর্মচারী বাবু রামরতন ব্যানার্জীর হাত ধরেই মুড়াপাড়ায় জমিদারির সূচনা। সততার পুরস্কার হিসেবে পাওয়া জায়গিরের ওপর ১৮৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এই জমিদারি। পরে তার ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী জমিদারির পরিধি আরও বিস্তৃত করেন।
১৯০৯ সালে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী জমিদার বাড়িটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন এলাকার একজন প্রভাবশালী জমিদার। তার সময়েই জমিদারি শাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে এই বিশাল প্রাসাদ।
প্রায় ৫২ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল জমিদার বাড়িটি প্রায় ১৭৮ বছরের পুরোনো। দোতলা ভবনটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। এর মধ্যে শোয়ার ঘর, দরবার হল, নাচঘর, আস্তাবল, উপাসনালয়, ভাণ্ডার ও কাচারি ঘর উল্লেখযোগ্য।
বিশাল প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। অন্দর মহলে রয়েছে আরও দুটি ফটক। শেষ ফটকের ভেতরে নারীদের গোসলের জন্য ছিল শানবাঁধানো পুকুর, যা চারদিকে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। বাইরের লোকদের সেখানে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
বাড়ির সামনে রয়েছে আরেকটি বড় পুকুর, যার চারপাশে নকশা করা ঢালাই লোহার গ্রিল এবং চারটি শানবাঁধানো ঘাট রয়েছে। মূলত এটি তৈরি করা হয়েছিল বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধন এবং অতিথিদের ব্যবহারের জন্য।
সদর দরজার সামনে দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। সে সময় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। সে কারণেই সম্ভবত বাড়িটি নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আনে। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
১৯৪৮ সালে তৎকালীন সরকার এখানে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র চালু করে। পরে ১৯৬৬ সালে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বর্তমানে এটি মুড়াপাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সময় বদলেছে, কিন্তু অবহেলার চিত্র বদলায়নি। ছাদে ফাটল, দেয়ালে ধস, জানালার কাঠ ভেঙে পড়ছে। অনেক কক্ষে গাছের শিকড় ঢুকে পড়েছে। ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা গাছ যেন ইতিহাসের বুক চিরে ওঠা আর্তনাদ।
কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান জানান, ‘সংস্কারের জন্য আমরা একাধিকবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। ভবনের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে যেহেতু ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে, তাই সরাসরি সংস্কার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাশেই আটতলা একটি নতুন ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। সেটি শেষ হলে কলেজের কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করা হবে। তখন ঐতিহাসিক ভবনটি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাইরের দেয়াল রং করে সাজানো হলেও ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক। নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র বা কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ।
তাদের মতে, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।
ইতিহাসপ্রেমীরা মনে করেন, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতকে আঁকড়ে ধরা নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তোলা। একটি জাতি যখন তার স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন হারায়, তখন সে নিজের শেকড়ও হারায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তা না হলে একদিন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।