
মেহেদী হাসান হাবিব, জামালপুর জেলা প্রতিনিধি
তারিখ: ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
জামালপুরের দুরমুঠে ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ছুঁইছুঁই। ধূপের সুবাস আর তপ্ত তালের পাখার বাতাসের মাঝে উচ্চারিত হলো পবিত্র মোনাজাত। হযরত শাহ কামাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমি দুরমুঠ মাজার শরীফ প্রাঙ্গণে বিশেষ মোনাজাত ও জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে আড়াইশ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ‘দুরমুঠ বৈশাখী মেলা’। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মেলাটি এখন কেবল জামালপুর নয়, বরং সমগ্র উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম বৃহত্তম লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
গত সোমবার রাতে মেলার শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবু।
উদ্বোধনী মোনাজাতের আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় প্রধান অতিথি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, “দুরমুঠ মেলা আমাদের শেকড়ের পরিচয়। প্রায় আড়াইশ-তিনশ বছর ধরে এই মেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে আসছে। এটি কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি আমাদের আবেগ ও ঐতিহ্যের মিলনস্থল।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সুলতান মাহমুদ বাবু বলেন, “হযরত শাহ কামাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্যভূমিতে মেলার এই আয়োজন আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে। মেলায় আগত ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে প্রশাসন সর্বদা সজাগ রয়েছে।”
মেলার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর মূলে রয়েছেন চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ কামাল (রহ.)। জনশ্রুতি রয়েছে, আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর আগে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই জনপদে পদধূলি দেন। তাঁর মাজার শরীফকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চল আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর মৃত্যুর পর ওরস মোবারক পালনের মধ্য দিয়েই এখানে ক্ষুদ্র পরিসরে জমায়েত শুরু হয়। তবে বর্তমান মেলার রূপটি মূলত ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি (প্রায় ১৭৫০–৬০ সাল) থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন গেজেটিয়ার ও ঐতিহাসিক দলিলে দুরমুঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাসব্যাপী এই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। মেলার বিশেষ আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
কারুপণ্য ও কুটির শিল্প: টাঙ্গাইল ও জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী আসবাবপত্র, মাটির তৈরি বাহারি তৈজসপত্র এবং বাঁশ-বেতের শৌখিন সামগ্রী।
খাদ্য রসিকদের স্বর্গরাজ্য: মেলার বিখ্যাত বড় জিলাপি, মণ্ডা-মিঠাই, কদমা-বাতাসা ও খই-মুড়ির সমারোহ।
বিনোদন: শিশুদের জন্য নাগরদোলা, মৃত্যুকূপ মোটরসাইকেল খেলা, সার্কাস এবং রাতে বাউল ও লোকজ গানের আসর।
মেলার প্রথম দিন থেকেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ আসছেন মাজার জিয়ারত ও কেনাকাটা করতে। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, পুরো মেলা প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া দর্শনার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আড়াইশ বছরের এই মেলাটি যেন সময়ের এক সেতুবন্ধন। একদিকে আধ্যাত্মিক চেতনা, অন্যদিকে বাঙালির বৈশাখী উৎসব—এই দুইয়ের মিশেলে দুরমুঠ মেলা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক গর্বিত উত্তরাধিকার। আগামী এক মাস এই মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।