
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বাজারে বছর ব্যবধানে গড় ইউনিট মূল্য কমেছে প্রায় ৩.৮৪ শতাংশ। সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসেই দাম কমেছে ১২ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের মতে, ইউরোপে চাহিদা কমে যাওয়া এবং মার্কিন শুল্কনীতির প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে শুরু হলেও জানুয়ারি পর্যন্ত পরবর্তী ছয় মাসে রফতানি আয় আর বাড়েনি। পোশাক শিল্প মালিকদের মতে, ইউরোপের বাজারে দামের পতন ও অর্ডার কমে যাওয়াই এ স্থবিরতার প্রধান কারণ।
পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাকের গড় দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। এতে রফতানিকারকদের মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, চীন ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাপে পড়ে এখন ইউরোপে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তাদের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ থাকায় তারা কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। ফলে বাংলাদেশ যে পণ্য পাঁচ ডলারে দিত, প্রতিযোগীরা তা চার ডলারে দিচ্ছে—এতে ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই কম দামের দিকে ঝুঁকছেন।
তিনি আরও জানান, ইউরোপের বাজার পুনরুদ্ধারে সরকারের কাছে ভর্তুকির আবেদন করা হয়েছে। এই ভর্তুকি শিল্প মালিকদের জন্য নয়, বরং শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।
বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করা গেলে তা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। অন্যান্য বাণিজ্য ব্লকের সঙ্গেও চুক্তি হলে রফতানি বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্ববাজারে গার্মেন্টস খাত এখন তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী হতে পারে। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কঠোর বাণিজ্য নীতির প্রভাবে ইউরোপ নিজস্ব বাণিজ্য সম্প্রসারণে আরও সক্রিয় হতে পারে। সেই সুযোগ বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে, যার প্রায় অর্ধেকই গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ফলে এ বাজারে দামের পতন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে—
দ্রুত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন
পণ্যের বহুমুখীকরণ
উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালীকরণ
নতুন বাজার অনুসন্ধান
—এসব কৌশল বাস্তবায়ন জরুরি।
ইউরোপের বাজারে দামের এই পতন তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা।