৩০ বছর পরও ছেলের বিচার চান নীলা চৌধুরী
- আপলোডের সময় : Sunday, September 6, 2026,

৩০ বছর পরও ছেলের বিচার চান নীলা চৌধুরী
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। ছেলে ইমনকে হারানোর পর কেটে গেছে ৩০ বছর। দীর্ঘ এই সময়েও ছেলের মৃত্যুর বিচার পাওয়ার দাবি থেকে সরে যাননি তার মা নীলা চৌধুরী।
সালমান শাহ হত্যা মামলা, ডনের গ্রেপ্তার, সামিরা ও শাবনূরসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইংল্যান্ড থেকে ‘কালবেলা’র সঙ্গে কথা বলেছেন নীলা চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিবাকর বিশ্বাস।
প্রশ্ন: ১৯৯৬ থেকে ২০২৬—কেটে গেছে ৩০ বছর। সালমান শাহ ছাড়া এ সময়টা কীভাবে কাটছে আপনার?
নীলা চৌধুরী: আমি তো সালমান শাহ ছাড়া নই। ওকে নিয়েই ৩০ বছর আমাদের কেটেছে, কাটছে, আগামীতেও কাটবে। ওকে ছাড়তে পারব না। ও আমার কলিজার ভেতর ছিল, কলিজার ভেতরেই থাকবে।
প্রশ্ন: সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। কী বলবেন?
নীলা চৌধুরী: এটা অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল। যেদিন মামলা হলো, সেদিনই আসামি গ্রেপ্তার হবে, রিমান্ড হবে—এমনটাই আশা ছিল। এতদিনে সব শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এটা সবার কাছে প্রত্যাশিত, অভাবনীয় কিছু নয়।
প্রশ্ন: ডন দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন না, গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় ছিলেন।
নীলা চৌধুরী: আজিজ মোহাম্মদ ভাই বলছেন, তিনি এখানে ছিলেন না। অথচ রিজভীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণে তিনি ছিলেন বলে জানা যায়। তার টিকিট কাটা ছিল। রিজভীর সাক্ষ্যেই ঘটনার বিবরণ আছে। সকালে ডন, সামিরার মা ও অন্যরা বের হয়ে গিয়েছিল। ডন জড়িত ছিল—আমরা জেনেছি, শুনেছি। আগেও শুনতাম, ইমনের সঙ্গে তার সখ্য নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রশ্ন: ডন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেদিন হরতালের কারণে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসতে পারেননি।
নীলা চৌধুরী: আপনারা পরীক্ষা করে দেখেন, ওইদিন হরতাল ছিল কি না। তিনি ফোন করে বলতে পারতেন, ‘আপনি ভুল বুঝেছেন’, অথবা ফেসবুকে বলতে পারতেন, ‘মা, ভুল বুঝেছ, আমি তোমার ছেলের খুনি না।’ আমাকে উল্টো চরিত্রহীন বলা হয়েছে। ইমন নাকি আমাকে মেরেছে। তিনি যদি বগুড়ায় থাকেন, তাহলে ইমন খুন হয়েছে নাকি আত্মহত্যা করেছে—কীভাবে জানেন? তিনি একগুঁয়েভাবে বলছেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছে। এটা প্রমাণ করার জন্য তিনি এতটা তৎপর কেন—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রশ্ন: সালমান শাহর সঙ্গে আপনার শেষ কথা কী হয়েছিল?
নীলা চৌধুরী: ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফোন দিয়েছিলাম ওকে বাসায় আসতে বললাম। ও বলল, ‘সোনা আম্মা, আমাকে যেতে বলো না। ফোনে বলো কী দরকার?’ আমি বললাম, তোমাকে আসতে হবে, জরুরি কথা আছে তোমার ব্যাপারে। সাড়ে ৭টার দিকে ওর বাবা গেলেন সেখানে। ও বলেছিল, সাড়ে ৮টায় আসবে। কিন্তু আর আসা হলো না।
প্রশ্ন: সালমান শাহর মৃত্যুর খবর কীভাবে পেলেন?
নীলা চৌধুরী: বাসায় একটা ফোন এলো। ইমনের আব্বা ফোন ধরলেন। ওপাশ থেকে বলা হলো, ভাইয়ার যেন কী হয়েছে, দেখতে হলে তাড়াতাড়ি আসেন। তখন আমরা খেতে বসেছিলাম, সিলেট যাব। ভাত ফেলে দিয়ে তালা দিয়ে চলে গেলাম। বের হয়ে দেখি, রাস্তায় লোক দৌড়াচ্ছে। ওর বাসার সামনে গিয়ে দেখি, প্রচুর লোক। বাসায় ঢুকে ওকে বিছানায় শোয়া দেখলাম। আবুল আর একটি মেয়ে তার গায়ে তেল দিচ্ছিল। সামিরাকে পাশে দেখিনি। আমরা তাকে নিয়ে হলি ফ্যামিলিতে গেলাম। কিন্তু তারা রাখেনি।
প্রশ্ন: সামিরাকে নিয়ে এই প্রসঙ্গে কী বলবেন?
নীলা চৌধুরী: সামিরা সবসময়ই দোষী থাকবে—এমনটাই আমি মনে করি। কারণ সে তার স্ত্রী ছিল। সে ঘরে ছিল এবং আজ পর্যন্ত সে কান্নাকাটি করেনি। সে আমাদের জানায়নি। আমাদের না জানিয়ে সে লাশ নামিয়ে ফেলল, গোসল করিয়ে ফেলল—এমন প্রশ্নও রয়েছে। ইমন মারা গেছে, সেই খবরটাও আমাদের দেওয়া হয়নি। সে ভেবেছে পার পেয়ে যাবে। ঢাকা মেডিকেল বলল, মারা গেছে। আমরা বিশ্বাস করিনি।
প্রশ্ন: সামিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সালমান শাহ-শাবনূরকে নিয়ে তখন বিভিন্ন খবর প্রকাশ হয়েছিল। সালমান-শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে কী বলবেন?
নীলা চৌধুরী: একটা ঘটনা আড়াল করার জন্য অনেক অবান্তর কথা বলা হতে পারে। অভিনয়ের জন্য সালমান শাহর সঙ্গে তো অনেক নায়িকারই দৃশ্য ছিল। শাবনূর ইমনের বেশিরভাগ সিনেমার নায়িকা ছিলেন। অভিনয়ের প্রয়োজনে তারা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করেছেন—এটাকে প্রেমের সম্পর্ক বলা যায় না। কোনো প্রেম ছিল না। সামিরা তো সবসময় সঙ্গে থাকত। এটা একটা ষড়যন্ত্র। আজিজের পয়সা খেয়ে হলুদ সাংবাদিকরা ওর ক্যারিয়ার নষ্টের চেষ্টা করেছে বলে আমি মনে করি। এর সঙ্গে সামিরাও জড়িত ছিল বলে আমার অভিযোগ।
প্রশ্ন: সালমান-সামিরার মধ্যে ঝামেলা আসলে কী নিয়ে হতো?
নীলা চৌধুরী: প্রথমে হতো রনিকে নিয়ে। সালমান শাহ কেন শুটিংয়ে যায়, সামিরার কথা কেন শুনল না, তাকে নিয়ে কেন বাইরে গেল না—এসব নিয়ে। সারা দিন ঘরে নানা ধরনের লোক থাকত, ডনও থাকত। ইমন শুটিংয়ে চলে যেত। চাকররা মাঝেমধ্যে বিষয়গুলো দেখত। মনসুর যা দেখেছে, তা বলেছে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে, এ জন্য টেলিফোনটাও নষ্ট করে রাখা হয়েছিল বলে আমার অভিযোগ। এসব নিয়েই তাদের মধ্যে ঝামেলা হতো।
প্রশ্ন: ডন গ্রেপ্তার হয়েছেন, সামিরা এই মামলার আসামি। তাকে নিয়ে কী বলবেন?
নীলা চৌধুরী: সামিরা আরও খারাপ হয়ে গেছে। সে নিজেই এমন কিছু করেছে, যা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে সে অনেক কিছু জানে। সে হাতে মারেনি, ভাতে মারছে। সে সবকিছুর সঙ্গে জড়িত ছিল বলে আমার অভিযোগ। তার মা ইন্ধন জুগিয়েছেন। সামিরার মা-বাবা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই—সবাই এক হয়ে গিয়েছিল বলে আমি মনে করি।
প্রশ্ন: সালমান শাহর লাশ যখন ঢাকা থেকে সিলেট নিয়ে যান, সেদিন পরিস্থিতি কেমন ছিল?
নীলা চৌধুরী: কোনো স্মৃতি নেই। কান্না করছি আর শুধু বলেছিলাম, চলো সিলেট যাই। কীভাবে গেছি জানি না। গাড়ি একটা জায়গায় থামার পর চার বোতল পানি খেয়েছি। আমার সামনে স্বামীকে লাশ নিয়ে যেতে দেখেছি। তখন আমার জ্ঞান ছিল না।
প্রশ্ন: সামিরা কেন সেদিন লাশের সঙ্গে সিলেট যাননি?
নীলা চৌধুরী: আমি সামিরার বাবার নম্বরে ফোন দিয়েছি। বলেছি, ইমনের লাশ দাফন হবে, সামিরাকে পাঠান। ওর বাবা বলেছেন, সামিরা যাবে না। সামিরার বাবা-মায়েরও তো আসা উচিত ছিল।
প্রশ্ন: সালমান শাহর মা হিসেবে এখন আপনার চাওয়াটা কী?
নীলা চৌধুরী: আমার ছেলে আঘাত পেয়েছে। যারা আঘাত করেছে, তাদের বিচার হোক। আমার ছেলেকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তার বিচার হোক। সামিরাসহ যারা মামলার আসামি, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক।
প্রশ্ন: ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনটি এলে আপনার সময় কীভাবে কাটে?
নীলা চৌধুরী: রোজ আমার কাছে ৬ সেপ্টেম্বর। ইমনের লাশটা বুকের ভেতর রেখে দিয়েছি। ও বুকের ভেতর আছে। আমি বিচার করিয়ে ছাড়ব। ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী নয়, আমার মৃত্যুবার্ষিকী। আমি ঘোষণা করলাম, ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ হত্যা দিবস। তাকে ওইদিন হত্যা করা হয়েছে। সেই হত্যার বিচার আমি রাষ্ট্রের কাছে চাই, বিশ্বের কাছে চাই। দেশে বিচার না হলে বিশ্বের যেখানে বিচার হবে, সেখানে যাব। বিচার আমি করিয়ে ছাড়ব।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।