বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের তাগিদ সাবেক প্রধান বিচারপতির
- আপলোডের সময় : Tuesday, September 15, 2026,

বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের তাগিদ সাবেক প্রধান বিচারপতির
স্টাফ রিপোর্টার
আমার সকাল ২৪
ঢাকা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি নিয়োগ, প্রশাসন, অর্থায়ন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনাসহ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন অডিটোরিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘Beyond Judicial Independence: Constitutional Identity and the Quest for Institutional Autonomy in Bangladesh’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সংবিধান শুধু কিছু লিখিত বিধান বা আইনগত দলিল নয়; এটি একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি, সংগ্রাম, আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত মূল্যবোধের প্রতিফলন। তবে এসব মূল্যবোধ তখনই কার্যকর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেগুলো ধারণ ও বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরে সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সাংবিধানিক শাসনের একটি অপরিহার্য শর্ত। তবে বিচারকের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাহ্যিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকাই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের নিয়োগ, প্রশাসন, অর্থায়ন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনাসহ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার, আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন হলো সেই অঙ্গীকারকে টেকসই করার কাঠামো।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ থাকলেও এসব মূল্যবোধ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার মতো শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ও কার্যকারিতা পরিবর্তিত হলে সাংবিধানিক শাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ওই সময় দেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষমতার আরও ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে প্রশাসনিক সক্ষমতা, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা, পেশাগত সততা ও জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনোভাবেই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানকে আইন, স্বচ্ছতা, পেশাগত নৈতিকতা ও সাংবিধানিক নীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কোনো সংস্কার যদি কেবল একজন ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট নেতৃত্বের সময় পর্যন্ত টিকে থাকে, সেটিকে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বলা যায় না।
তিনি বলেন, টেকসই সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যেও নিজস্ব মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। ভালো নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। টেকসই সাংবিধানিক শাসনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পাশাপাশি ন্যায়, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অনুষ্ঠানে আইন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।