
মোঃ জাহিদুল ইসলাম
ক্রাইম রিপোর্টার
বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে একটি রহস্যময় যান্ত্রিক বস্তু উঠে এসেছে, যা দেখতে অনেকটা পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় গবেষণা যানের মতো। প্রায় আট ফুট দীর্ঘ লাল-হলুদ রঙের এ যন্ত্রটি উদ্ধার হওয়ার পর স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়, প্রশাসন এবং গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি ‘অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল’ (AUV) বা স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের গবেষণা যান হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমুদ্র গবেষণা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রতল মানচিত্রায়ণ, জলবায়ু তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক নজরদারির কাজে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার বিকেলে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফার হাট এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার বঙ্গোপসাগরের মোহনা এলাকায় মাছ শিকারে যায়। জাল তোলার সময় জেলেরা অস্বাভাবিক ভার অনুভব করেন। পরে জাল তুলে তারা দেখতে পান একটি অচেনা যান্ত্রিক বস্তু।
ট্রলারের জেলে মিরাজ হোসেন বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল বড় কোনো মাছ জালে আটকা পড়েছে। পরে দেখি এটি একটি যন্ত্র। আমরা আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি।”
তিনি জানান, যন্ত্রটির গায়ে পাখার মতো অংশ এবং ভেতরে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দেখে প্রথমে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই এটিকে ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ বা সামরিক সরঞ্জাম বলে ধারণা করেছিলেন। পরে সেটি ট্রলারে তুলে সোমবার সকালে পাথরঘাটায় নিয়ে আসা হয় এবং থানায় খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ যন্ত্রটি নিজেদের হেফাজতে নেয়।
উদ্ধার হওয়া যন্ত্রটির ছবিতে দেখা যায়, এটি টর্পেডোর মতো দীর্ঘ সিলিন্ডার আকৃতির। এর উভয় প্রান্ত গোলাকার এবং পেছনের অংশে স্থিতিশীলতার জন্য পাখা বা ফিন সংযুক্ত রয়েছে। ওপরের অংশ খুললে ভেতরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মডিউল, ব্যাটারি ইউনিট, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অ্যানটেনাসদৃশ যোগাযোগ ডিভাইস দেখা যায়।
যন্ত্রটি সম্পর্কে জানতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজের কাছে এর ছবি পাঠানো হয়। তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে দেখে আমার ধারণা এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল (AUV) হতে পারে। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি বা শক্তি হারানোর কারণে এটি স্রোতের টানে উপকূলের দিকে ভেসে এসেছে।”
তিনি আরও জানান, এ ধরনের যান সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে এবং পরবর্তীতে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে অথবা তথ্য প্রেরণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী এবং অফশোর তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। তবে বাংলাদেশের জলসীমায় এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারের তথ্য খুব বেশি জানা যায় না।
গবেষকদের মতে, যন্ত্রটির প্রকৃত পরিচয় জানতে এর সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের তথ্য, সংরক্ষিত ডেটা, সেন্সর কনফিগারেশন এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ ডেটা অক্ষত থাকলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কতদিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পাথরঘাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সোহান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে যন্ত্রটি পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। এর উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, “যদি এটি সত্যিই একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের উপকূলে এ ধরনের প্রযুক্তিগত যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ সামুদ্রিক গবেষণা ও নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।”
ঘটনাটি ইতোমধ্যে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। যন্ত্রটির প্রকৃত পরিচয় ও উৎস উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সবাই।