প্রজন্মের পর প্রজন্ম বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করছে: প্রধানমন্ত্রী
- আপলোডের সময় : Saturday, October 3, 2026,

প্রজন্মের পর প্রজন্ম বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করছে: প্রধানমন্ত্রী
বঙ্গোপসাগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শতাধিক দেশের দুই শতাধিক বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে।
তিনি বলেন, অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা আরও গভীর করা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। শান্তি ও সম্প্রীতিকে যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি অঞ্চলে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে দেশগুলো একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকদের মধ্যে অর্থবহ সহযোগিতা বাড়বে।
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্রে গড়ার পরিকল্পনা
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা ও নীতিগত নিশ্চয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব
তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। তরুণদের বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি ‘ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর কথা জানিয়ে তিনি ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ডের সমন্বয়ে একটি ইউনিভার্সেল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা বলেন। শিশুদের শিক্ষায় ইউনিফর্ম ও মিড-ডে মিলসহ বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করেন।
কৃষি ও পানি নিরাপত্তায় পরিকল্পনা
কৃষিকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
পানি নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানান তিনি। এসব উদ্যোগ কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড-সার্টিফায়েড কারখানার ৫৩টি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও মানবাধিকারের ওপর গুরুত্ব
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার কথাও বলেন তিনি।
আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা বলেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংকটের মূল কারণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, এর সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে।
এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের প্রতিপাদ্য ‘Fragments, Frontiers and Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Rewritten’। সম্মেলনের আলোচনায় ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সংযোগ, জলবায়ু ও মানব নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্র ও সুশাসনসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে।
সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ও মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।