পাবনায় চায়না দুয়ারির সর্বগ্রাসী ফাঁদে বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ
- আপলোডের সময় : Tuesday, September 15, 2026,

পাবনায় চায়না দুয়ারির সর্বগ্রাসী ফাঁদে বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ
আহমেদ শাকিল সুমন
ক্রাইম রিপোর্টার, আমার সকাল ২৪
পাবনা
নদীর পানি কমেছে, কিন্তু কমেনি নিষিদ্ধ জালের দাপট। অগভীর পানির তলদেশ ঘেঁষে পাতা হচ্ছে একের পর এক নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’। জালের সূক্ষ্ম ফাঁস ভেদ করে বের হতে পারছে না রেণু-পোনা, ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজপ্রাণী। এতে একদিকে প্রতিদিন কমছে মাছের মজুত, অন্যদিকে প্রজননক্ষম মাছ কমে যাওয়ায় হুমকিতে পড়ছে ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদ। পাবনার পদ্মা, যমুনা, ইছামতী, বড়াল ও চলনবিলের বিভিন্ন অংশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
একসময় পাবনার নদী-বিল ছিল দেশি মাছের অন্যতম বড় ভাণ্ডার। স্থানীয় হাট-বাজারে পাবদা, টেংরা, বোয়াল, শিং, মাগুর, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছের সরবরাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন অনেক এলাকায় এসব মাছ আগের তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্বিচারে রেণু-পোনা ও মা-মাছ আহরণ চলতে থাকলে বেশ কিছু দেশি মাছের প্রজাতি স্থানীয় জলাশয় থেকে আরও দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে।
সরেজমিনে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার চলনবিলের বিভিন্ন অংশ এবং বেড়া ও সাঁথিয়ার নদ-নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অগভীর পানিতে তলদেশের কাছাকাছি পেতে রাখা হয়েছে চায়না দুয়ারি। দূর থেকে অনেক সময় এসব জাল বোঝার উপায় নেই। লোহার রিং দিয়ে তৈরি বক্স আকৃতির ফাঁদের মুখ দিয়ে মাছ ঢুকে পড়লে বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। জালের ফাঁস এতটাই ছোট যে রেণু-পোনা ও অতি ছোট মাছও আটকা পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষার শুরুতেই ইছামতী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে এই জালের ব্যবহার বাড়তে থাকে। সুজানগরের গাজনার বিলেও একই চিত্র দেখা যায়। রাতের বেলায় কিংবা দুর্গম বিল এলাকায় জাল পেতে মাছ ধরায় অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রশাসনের নজরে আসে না। ফলে দিনের বেলায় অভিযান চললেও রাতের আঁধারে আবার নতুন করে জাল বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
চায়না দুয়ারির ক্ষতি শুধু মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুঁচে, কাঁকড়া ও বিভিন্ন জলজ কীটপতঙ্গও এই জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এসব প্রাণী জলজ পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে নির্বিচারে আহরণের কারণে নদী ও বিলের স্বাভাবিক প্রতিবেশব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা মা-মাছ ও পোনা একসঙ্গে ধরা পড়ায় মাছের প্রজননচক্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাবনার বিভিন্ন উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নিয়মিত চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হচ্ছে। অভিযানে অনেক সময় হাজার হাজার মিটার জাল উদ্ধার হচ্ছে। তবে অভিযানের পরও ব্যবহার বন্ধ না হওয়ায় নজরদারি ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আটঘরিয়া, বেড়া, কাশিনাথপুর ও চাটমোহরের কয়েকটি হাটে গোপনে চায়না দুয়ারি বিক্রি হচ্ছে। তাদের মতে, শুধু জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে উৎসেই সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা এবং বৈধ জাল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়াও জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি চায়না দুয়ারি তাৎক্ষণিকভাবে মাছ ধরার সুযোগ দিলেও এর বিনিময়ে ধ্বংস হচ্ছে ভবিষ্যতের মৎস্যসম্পদ। তাই নদী-বিলের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান এবং বিক্রয়কেন্দ্রে কঠোর তদারকি জরুরি। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পাবনার নদী-বিল থেকে হারিয়ে যেতে পারে বহু দেশি মাছের প্রজাতি। মাছের ঐতিহ্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ জোরদার করা প্রয়োজন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।