পদ্মার বুকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, বাড়ছে পর্যটকের ভিড় ও স্থানীয়দের উদ্বেগ
- আপলোডের সময় : Monday, August 24, 2026,

পদ্মার বুকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, বাড়ছে পর্যটকের ভিড় ও স্থানীয়দের উদ্বেগ
রাজশাহীর পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মিডলচর ইতোমধ্যে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই চরটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। ছুটির দিনে ভিড় জমছে আরও বেশি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দর্শনার্থীরা ভিড় করলেও বাড়তি পর্যটকের চাপে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর ক্ষতি এবং ড্রোন ক্যামেরার অবাধ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ কেউ অনুমতি ছাড়াই বাড়িতে প্রবেশ করছেন। আবার পানি খাওয়ার অজুহাতেও অপরিচিত ব্যক্তিদের বাড়িতে ঢোকার ঘটনা ঘটছে। এতে নারী ও শিশুদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ড্রোনে বাড়ছে অস্বস্তি
দর্শনার্থীদের ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহারে স্থানীয়দের অস্বস্তি আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম নেছা বলেন, গোসলের সময় মাথার ওপর কোনো ছাদ থাকে না। তখন ড্রোনের মাধ্যমে ছবি ধারণ করা হলে তারা অস্বস্তিতে পড়েন। এ বিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি।
ক্ষতির মুখে কৃষি ও গবাদিপশু
পর্যটকের ভিড়ে চরের কৃষি ও গবাদিপশু পালনেও প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা লালন আহমেদ বলেন, তারা বছরে একবার কলাই চাষ করেন। অতিরিক্ত মানুষের চলাচলের কারণে এ বছর ফসল চাষ করা যাবে কি না, তা নিয়েই তারা চিন্তিত।
গবাদিপশু পালনকারী ইব্রাহিম হোসেন বলেন, গরু ও ভেড়া পালনই তাদের প্রধান জীবিকা। কিন্তু দর্শনার্থীদের ভিড়ে চরের ঘাস নষ্ট হচ্ছে। অনেকে গরুর সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে পশুগুলোকে বিরক্ত করেন। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা ও পলিথিনে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে।
সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা
তবে মিডলচরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, চরটি খোলা জানালার মতো। শহরের কাছেই হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে আসা যায়।
পার্শ্ববর্তী এলাকার আইনজীবী সোহাগ বান্না সোহাগ বলেন, নদী, চর ও নৌকা ভ্রমণের সমন্বয়ে জায়গাটি অসাধারণ। পরিবার নিয়ে এসে শিশুরাও আনন্দ পেয়েছে।
পরিকল্পিত পর্যটনের সম্ভাবনা
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে মিডলচর রাজশাহীর পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। নিরাপদ নৌযাত্রা, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় নৌকার মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা এবং যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করতেও মাঝিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তায় পুলিশের নজরদারি
রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, পদ্মা নদীতে এখন ভরা মৌসুম। তাই যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ও মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে প্রবেশ, হয়রানি কিংবা ড্রোনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিসরে ছবি ধারণের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের স্থানীয়দের প্রতি সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষার আহ্বান
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, মিডলচরের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় দর্শনার্থীদের সচেতন হতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার এবং কৃষিজমির ক্ষতি থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তুলতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।










