ডলার লেনদেনে ৫৪ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ, পদোন্নতি পেলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা
- আপলোডের সময় : Tuesday, August 25, 2026,

ডলার লেনদেনে ৫৪ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ, পদোন্নতি পেলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা মজুত ও কোষাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক শাহনেওয়াজ সুমনের বিরুদ্ধে ডলার কেনাবেচায় অনিয়ম, চিকিৎসা বিল নিয়ে অসংগতি, শিক্ষাছুটির শর্ত ভঙ্গ এবং ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ মে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কাছে ১১০ টাকা দরে ৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিনে ১১৬ টাকা ৪৬ পয়সা দরে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়। একই ভ্যালুডেটে ভিন্ন বিনিময় হার ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই দিনই দেশে প্রথমবারের মতো ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ডলার কেনাবেচার চারটি চুক্তির মধ্যে দুটি বিক্রয় চুক্তিতে ৮ মে ২০২৪ তারিখ দেখানো হলেও নথি ও ই-মেইল কনফার্মেশন থেকে সেগুলো ৯ মে সম্পন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তে আরও বলা হয়, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে লেনদেনগুলো অনুমোদন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ডিলের বিবরণীতে অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডিল অনুমোদন করে ব্যাক অফিসে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অপারেশন ম্যানুয়াল’ অনুযায়ী প্রতিদিনের ডিল স্লিপ, ফরম্যাট ও বিবরণী নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট মিডল ও ব্যাক অফিসে পাঠানোর কথা। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ এপ্রিলের পর থেকে নিয়মিতভাবে এসব নথি পাঠানো হয়নি। কখনো এক থেকে দুই সপ্তাহ পরপর, আবার কখনো অনিয়মিতভাবে নথিপত্র পাঠানো হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন একজন ডেপুটি গভর্নর ও শাহনেওয়াজ সুমনের যোগসাজশে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ওই অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর বিনিময়ে ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অবশ্য সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
পিএইচডি প্রেষণ নিয়েও প্রশ্ন
শাহনেওয়াজ সুমন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়তে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার জন্য ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আদেশের মাধ্যমে পূর্ণ বেতন-ভাতায় প্রেষণ পান। তার প্রেষণের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত।
তবে নথি অনুযায়ী, তিনি ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট দেশে ফিরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন। পিএইচডি সম্পন্ন না করে দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রেষণের শর্ত অনুযায়ী শিক্ষাক্রম অসমাপ্ত রেখে ফিরে এলে প্রাপ্ত সুবিধা ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেষণে থাকার সময় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টর’-এর বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত জিমেইল ব্যবহার এবং সংবেদনশীল তথ্য বাইরে সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
মেডিকেল বিল নিয়েও তদন্ত
২০২৫ সালের ৪ মে শাহনেওয়াজ সুমনের চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত সুবিধা যাচাই করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই তদন্তে তার উপস্থাপিত কিছু মেডিকেল বিল ও ভাউচার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তদন্ত কমিটি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ কেনার ভাউচার যাচাই করে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা এবং ওষুধের দোকানের তথ্য যাচাইয়ের পর কিছু ভাউচারের যথার্থতা নিয়ে অসংগতি পাওয়া যায় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানে কম্পিউটারাইজড ভাউচার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শাহনেওয়াজ সুমনের জমা দেওয়া কিছু বিল ম্যানুয়াল ভাউচারে করা ছিল। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শে উল্লেখিত ওষুধের মাত্রা নিয়েও তদন্ত কমিটি প্রশ্ন তোলে।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে শাহনেওয়াজ সুমন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে হয় না। প্রচলিত নীতিমালা, বাজার পরিস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের ভিত্তিতেই ডলার কেনাবেচা করা হয়। ক্রলিং পেগ ব্যবস্থা চালুর সময় বিনিময় হার পুনর্নির্ধারণের কারণে ওই লেনদেন হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ডিলের ফরওয়ার্ডিংয়ে অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাক্ষর ছিল।
পিএইচডি শেষ না করে দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, থিসিস জমা দিয়েছেন এবং তার ভাইভা বাকি রয়েছে। প্রয়োজন হলে ভাইভা দিতে আবার মালয়েশিয়ায় যাবেন।
মেডিকেল বিলের বিষয়ে শাহনেওয়াজ সুমন বলেন, বিষয়টি ‘সেটেলড’ এবং এ বিষয়ে তাকে ডেকে ব্যাখ্যা নেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, তিনি ক্যানসারের রোগী এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসারেই ওই সুবিধা নিয়েছেন। এর সঙ্গে ডলার লেনদেনের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
ব্যবস্থা না নিয়ে পদোন্নতির অভিযোগ
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পরও তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং শাহনেওয়াজ সুমনকে অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ঘটনাকে বহুমুখী অনিয়ম ও প্রতারণার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদেরও তদন্তের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার মতে, অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলো নিয়ে এখন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ডলার লেনদেনে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির দায় কার—সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।










