গালির রাজনীতি নয়, প্রয়োজন শালীনতা ও যুক্তির চর্চা
- আপলোডের সময় : Thursday, September 10, 2026,

গালির রাজনীতি নয়, প্রয়োজন শালীনতা ও যুক্তির চর্চা
রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত মান ও পরিশীলিত ভাবমূর্তি একটি জাতির সামাজিক, নৈতিক ও সভ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, মতাদর্শগত দ্বিমত, রাজপথের উত্তাপ এবং তীক্ষ্ণ সমালোচনা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে সেই সমালোচনা যখন নীতি ও যুক্তির সীমা অতিক্রম করে কুরুচিপূর্ণ ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, তথ্যবিকৃতি ও অশালীন বক্তব্যে পরিণত হয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; সমাজের সামগ্রিক রুচি ও নৈতিক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইতিহাসের নানা পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। কিন্তু সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশে মতের বিরোধ থাকলেও ভাষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যে অশালীনতা ও দায়িত্বহীনতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
গাজীপুরের তরুণ সিফাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও এ আলোচনাকে সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদ্দেশে তার ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। সরকারের নীতি, বিদ্যুৎ বিল কিংবা জনদুর্ভোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা একজন নাগরিকের অধিকার। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিগত অপমান, অশালীন ভাষা কিংবা যাচাইহীন তথ্য প্রচার কোনোভাবেই দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের উদাহরণ হতে পারে না।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সিফাতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক তদন্তের কথাও সামনে এসেছে। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, তার বাবার নামে থাকা দোতলা বাড়িটিতে তিনটি পৃথক আবাসিক মিটার রয়েছে। মে থেকে আগস্ট—চার মাসে তিনটি মিটারে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে মোট বিল হয়েছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা। তদন্তকারী দলের তথ্য সংগ্রহের সময় স্বজনদের অসহযোগিতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তৈরি হয়েছে, তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা জরুরি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তরুণ ভুল করলে তাকে আরও উত্তেজিত করা নয়, বরং যুক্তি, শালীনতা ও দায়িত্বশীলতার পথে ফিরিয়ে আনা জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার বক্তব্যকে সমর্থন বা সমালোচনা করার ক্ষেত্রেও ইতিহাস, তথ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে নূর হোসেন, ডা. শামসুল আলম খান মিলন কিংবা ইয়াসমিনের মতো মানুষের আত্মত্যাগের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তারা গণতন্ত্র, অধিকার ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। ফলে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাউকে তুলনা করার আগে সেই তুলনার যথার্থতা ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বিরোধী রাজনীতি গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। সরকারের সমালোচনা করা, নীতির বিরোধিতা করা কিংবা জনগণের দাবি সংসদ ও রাজপথে তুলে ধরা—সবই গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ। কিন্তু বিরোধিতার নামে অশালীনতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা যাচাইহীন তথ্য প্রচার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে না; বরং তা জনপরিসরের ভাষাকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত সাংবাদিক, ইউটিউবার কিংবা বিভিন্ন কনটেন্ট নির্মাতার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল ভিউ, লাইক ও অনুসারী বাড়ানোর জন্য উত্তেজনাপূর্ণ বা অশালীন বক্তব্যকে জনপ্রিয় করে তোলা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমচর্চা হতে পারে না। সংবাদ ও মতামতের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট তুলে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা জরুরি।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও মনে রাখা প্রয়োজন—আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দল, মত বা ব্যক্তির পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না। কেউ আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বৈধ পরিসরও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন স্বাধীন মতপ্রকাশ ও আইনের শাসন পাশাপাশি কার্যকর থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন দল ও জোটের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অতীত ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সমালোচনা চলতেই পারে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় দলগুলোর অবস্থান ইতিহাসের অংশ। তবে অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পরিবর্তে তথ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বর্তমান সময়েও নতুন রাজনৈতিক দল ও জোটের উত্থান ঘটছে। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থের উৎস, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কিংবা ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর উত্তর তথ্য ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দেওয়া উচিত। অনুমান, অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো একটি সহনশীল ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সংসদ কার্যকর থাকলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছানোর সুযোগও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
তাই দাবি আদায়ের নামে জনগণের ভোগান্তি বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় সংঘাত সৃষ্টি কিংবা উত্তেজনা ছড়ানোর পরিবর্তে আলোচনার পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, আন্দোলন হবে, সরকারের সমালোচনা হবে—কিন্তু সেই সবকিছুর ভিত্তি হওয়া উচিত যুক্তি, তথ্য ও দায়িত্বশীলতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দিয়ে যেতে চাই। তারা কি শিখবে যে জোরে গালি দেওয়া মানেই সাহস? নাকি শিখবে যে তথ্য, যুক্তি ও শালীন ভাষায় ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা?
গালাগাল কোনো বীরত্ব নয়। অশালীনতা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নয়। অপপ্রচার কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে আইন প্রয়োগকে প্রশ্নাতীত মনে করাও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সরকার সমালোচনা গ্রহণ করবে, বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং নাগরিকেরা তথ্যভিত্তিক মতপ্রকাশের সুযোগ পাবেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান—সস্তা জনপ্রিয়তা ও সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে সংসদীয় নিয়মনীতি, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং গঠনমূলক আলোচনায় ফিরে আসুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষাকেও হতে হবে সংযত ও দায়িত্বশীল।
গালির রাজনীতি নয়—শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সত্যনিষ্ঠা ও যুক্তির রাজনীতিই পারে একটি পরিণত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও বিবেকবোধ দান করুন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।