গণপূর্তে বদলি বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন
- আপলোডের সময় : Sunday, September 6, 2026,

গণপূর্তে বদলি বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন
বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, সনদ জালিয়াতি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি, বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততা এবং অধিদপ্তরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি-পদায়ন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনোটি সত্য নয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবও জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণ করছে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বদলি-পদায়ন নিয়ে ক্ষোভ
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন নিয়ে সম্প্রতি নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হলেও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে সেই স্বচ্ছতা সব ক্ষেত্রে বজায় রাখা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, লটারির কার্যক্রম শুরুর আগেই পছন্দের কিছু কর্মকর্তার নাম নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা হয়। পরে লটারির মাধ্যমে তাদের নাম ওঠানো দেখিয়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারী কয়েকজন প্রকৌশলী জানান, নিজ জেলা বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের বিধান থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। ঢাকা থেকে ঢাকায় পদায়ন এড়িয়ে চলার নীতিরও যথাযথ প্রয়োগ হয়নি বলে তাদের দাবি।
তাদের অভিযোগ, ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর নাম ঢাকা জেলার লটারির বাক্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তাদের নাম ওঠার পর ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে।
লটারি নিয়ে যেসব প্রশ্ন
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের জন্য ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে দুটি লটারির বাক্স রাখা হয়। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঢাকা জেলার বাক্সে শুধু সংশ্লিষ্ট যোগ্য কর্মকর্তাদের নাম থাকার কথা থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকার কর্মকর্তাদের নাম সেখানে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) পর্যায়ের ৪১ জনের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া কয়েকজন প্রকৌশলীর পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ঢাকার বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবারও ঢাকায় পদায়ন পেয়েছেন। বিপরীতে কয়েকজন কর্মকর্তা সম্প্রতি ঢাকায় যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ঢাকার বাইরে বদলি হয়েছেন।
এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। সেখানে বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, বৈষম্য ও কারসাজির অভিযোগ তুলে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের জন্য আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ক্ষেত্রে কয়েকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ বণ্টনেও একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক দিনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ব্যাপক বদলির বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
পরে প্রধান প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের বদলির অধিকাংশ বাতিল করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর নামও এসেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পিএইচডি সনদ নিয়ে অভিযোগ
মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষার ছুটি ও প্রেষণ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল এবং তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয় উঠে আসে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে তিনি শাস্তির পরিবর্তে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের দণ্ড পান এবং এর পর অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক পদোন্নতি লাভ করেন।
তার পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী।
সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগ
প্রধান প্রকৌশলীর পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার তথ্য ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর দাবি, জুলাইয়ের আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে একটি মামলায় কৌশলে ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এসব মামলার তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কাছে পাঠানো হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও মামলার তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। পরে ভবনটির নকশা অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১১ সালে রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার হিসেবে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন ওই ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
পরবর্তী তদন্তে ভবনটির জরুরি বহির্গমন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবগত।
নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বদলি লটারির মাধ্যমে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে।
জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে মামলার তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কোনো প্রতিযোগী নেই।
যা বলছে মন্ত্রণালয়
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি।
প্রধান প্রকৌশলীর পদে থাকা কর্মকর্তাদের প্রতিযোগী বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ও লেখালেখি হচ্ছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় খালেকুজ্জামান চৌধুরী তিন নম্বরে রয়েছেন এবং তার ওপর আরও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আছেন। প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রেড-১ পদে যাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করতে বিষয়টি এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।