
এশিয়ান গেমস সামনে রেখে যেখানে ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য পদক জয় এবং কৌশল নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনের, সেখানে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। মাঠের লড়াইয়ের আগেই শুরু হয়েছে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, কর্তৃত্বের হিসাব-নিকাশ এবং কর্মকর্তা-অফিসিয়ালদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে টানাপড়েন।
বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের তালিকা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে এবং ক্রীড়াবিদদের নিবন্ধন প্রক্রিয়াও শেষ। এমন সময় সরকার ২৭টি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি গঠন করায় তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। পুরোনো কমিটির কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে কন্টিনজেন্ট তালিকায়। অন্যদিকে নতুন কমিটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, এশিয়ান গেমসে যাওয়ার সুযোগ তাদেরই প্রাপ্য। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব।
এটি শুধু কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতার প্রতিফলন। ফেডারেশনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে প্রায়ই জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতার সমীকরণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং নানা প্রভাব। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বড় একটি আন্তর্জাতিক আসরের ঠিক আগে।
চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময় প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ক্রীড়াবিদদের মনোযোগ ও মানসিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ বি এম শেফাউল কবির বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কন্টিনজেন্ট তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে কিছু ফেডারেশন পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী গেমস কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
অন্যদিকে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপনের বক্তব্যে বিতর্ক আরও বেড়েছে। তিনি জানান, কয়েকটি ফেডারেশনের কর্মকর্তারা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে বর্তমান কমিটির কর্মকর্তাদের এশিয়ান গেমসে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই অনুযায়ী কোচ ও অফিসিয়াল পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে।
এতে স্পষ্ট, সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মকর্তা ও অফিসিয়ালদের তালিকা। অথচ আন্তর্জাতিক আসরে দেশের প্রতিনিধিত্বের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্রীড়াবিদদের সর্বোচ্চ সাফল্য নিশ্চিত করা।
এ পরিস্থিতিতে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন কাবাডি ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম নেওয়াজ সোহাগ। তিনি বলেন, দলের সঙ্গে কে টেকনিক্যাল অফিসিয়াল বা কর্মকর্তা হিসেবে যাবেন, সেটি বর্তমান কমিটির সিদ্ধান্তের বিষয়। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ ও দলের পারফরম্যান্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তার এই বক্তব্য চলমান বিতর্কের মূল প্রশ্নটিই সামনে আনে—প্রাধান্য পাবে ব্যক্তি স্বার্থ, নাকি দেশের স্বার্থ?
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এমন সময় অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে, যখন ফেডারেশনগুলোর প্রধান মনোযোগ থাকার কথা ছিল অনুশীলন, প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স উন্নয়নে। কিন্তু বাস্তবে সময় ব্যয় হচ্ছে কর্মকর্তা পরিবর্তন, তালিকা সংশোধন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে।
বাংলাদেশ এমনিতেই এশিয়ান গেমসে সীমিত সম্ভাবনা নিয়ে অংশ নেয়। তাই প্রস্তুতির প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মাঠের ফলাফলে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় আসরের আগে এমন টানাপড়েন নতুন নয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন কর্মকর্তারা, তখন ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুতি ও পদক জয়ের স্বপ্ন কোথায়?
শেষ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারণ করবেন মাঠে লড়াই করা ক্রীড়াবিদরাই। তাই পদ ও পদায়নের লড়াই নয়, এখন সবচেয়ে জরুরি দেশের পতাকা উঁচু করার লক্ষ্যে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা।