ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, সরকারি সিকিউরিটিজে ঝুঁকছে ব্যাংক
- আপলোডের সময় : Saturday, September 19, 2026,

ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, সরকারি সিকিউরিটিজে ঝুঁকছে ব্যাংক
ডেস্ক রিপোর্ট
আমার সকাল ২৪
ঢাকা
ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণের চাহিদা ও বিতরণে ধীরগতির মধ্যে ঝুঁকি এড়াতে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে একদিকে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ ও মূলধনের ওপরও বাড়ছে চাপ। ফলে শুধু নতুন করে মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংক খাতের সংকট সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পল্টনে ‘ইন-ডেপথ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস অব ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) ও সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চে এ হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর ওপর প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে।
তিনি বলেন, শুধু আমানত বাড়লেই ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। আমানতের বিপরীতে কতটা ঋণ বিতরণ হচ্ছে, কতটা বিনিয়োগ করা হচ্ছে, নগদ অর্থের প্রবাহ কেমন এবং দায় পরিশোধের সক্ষমতা কতটা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ব্যাংকের প্রকৃত তারল্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।
খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আয়, প্রভিশন সংরক্ষণ ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্যেও খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে তারল্য, মূলধন, ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে শুধু আমানত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কার্যকর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে সংস্কারের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। হঠাৎ করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে ব্যাংকের পাশাপাশি আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
আইএফআরএস ৯ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ব্যাংকের ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ ও প্রভিশন সংরক্ষণ জরুরি। তবে খেলাপি ঋণ ও মূলধনের চাপে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য আইএফআরএস ৯ বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
ব্যাংক সংস্কারে পৃথক কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব
অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি পৃথক ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন, ব্যাংক তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে পৃথক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, ঋণ অনুমোদনে পরিচালনা পর্ষদের সরাসরি ভূমিকা কমানো এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের প্রস্তাব দেন নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিনহাজ জিয়া।
মিনহাজ জিয়া বলেন, দেশের মানুষের সঞ্চয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এখনো ব্যাংক ব্যবস্থায় রয়েছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। তবে সংস্কারের আগে সমস্যার প্রকৃত চিত্র চিহ্নিত করা জরুরি।
তার মতে, ব্যাংক খাতে কোথায় স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে আর কোথায় সম্পদ পুনরুদ্ধার বা পুনর্গঠন করা সম্ভব—তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। যে অর্থ প্রকৃত অর্থেই দেশের বাইরে চলে গেছে বা আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে না, সেটিকে লুকিয়ে না রেখে স্থায়ী ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
মিনহাজ জিয়া বলেন, দুর্বল ব্যাংকে শুধু নতুন করে মূলধন ঢাললেই সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাংকের পরিচালন কাঠামো, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, তদারকি, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আইনি কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রয়োজন।
পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা কমানোর প্রস্তাব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মিনহাজ জিয়া। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংককে একসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ মুদ্রামানের স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিপুলসংখ্যক ব্যাংক তদারকির দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, ব্যাংকের তহবিলের প্রধান উৎস আমানতকারীদের অর্থ। কিন্তু মালিক বা স্পন্সরদের নিজস্ব মূলধনের অংশ তুলনামূলকভাবে কম হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব বেশি থাকে। এর ফলে পর্ষদের প্রভাবাধীন ঋণ বিতরণ ও দুর্বল ঋণমানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন মিনহাজ জিয়া। ১০ সদস্যের একটি পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক হতে পারেন বলেও মত দেন তিনি।
ঋণ অনুমোদনে পরিচালনা পর্ষদের সরাসরি ভূমিকা বন্ধেরও প্রস্তাব করেন তিনি। তার মতে, পরিচালনা পর্ষদের কাজ হওয়া উচিত ব্যাংকের নীতিমালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকি করা। নির্দিষ্ট কোনো ঋণ অনুমোদন করা পর্ষদের কাজ হওয়া উচিত নয়।
এর পরিবর্তে প্রতিটি ব্যাংকে স্বাধীন ও পেশাদার ঋণ মূল্যায়ন ও অনুমোদন কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি। এ কাঠামো পরিচালনা পর্ষদের কাছে জবাবদিহি করবে, তবে নির্দিষ্ট ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্ষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে না। একই সঙ্গে একক গ্রাহকের ঋণসীমা, খাতভিত্তিক ঋণসীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিধান কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় এএমসি
ব্যাংক পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন করার ওপরও গুরুত্ব দেন মিনহাজ জিয়া। তার মতে, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনার প্রভাবমুক্ত থেকে এসব ইউনিট কাজ করতে পারলে অনিয়ম ও ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি। তার মতে, ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে বছরের পর বছর খেলাপি ঋণ পড়ে থাকলে ব্যাংকের মূলধন আটকে যায় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। এসব সম্পদ আলাদা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করে পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন বা বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা সহজ হবে।
এ জন্য দেউলিয়া আইন, সম্পদ হস্তান্তর, স্ট্যাম্প ডিউটি এবং ঋণ সিকিউরিটাইজেশনের মতো আইনি কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ব্যাংকের ঋণকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্পদ হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতে যাতে তা বাজারে হস্তান্তরযোগ্য ও লেনদেনযোগ্য সম্পদে পরিণত করা যায়, সে জন্য একটি কার্যকর ঋণবাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রভিশন সংরক্ষণের বর্তমান কাঠামো নিয়েও আলোচনা করেন মিনহাজ জিয়া। তার মতে, ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণে ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা, খেলাপি হলে কত শতাংশ অর্থ উদ্ধার করা যাবে এবং কত সময়ের মধ্যে তা উদ্ধার সম্ভব—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশে ঋণ কেনাবেচার কার্যকর বাজার না থাকায় ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা বা ‘প্রবাবিলিটি অব ডিফল্ট’ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। একটি সক্রিয় ঋণবাজার গড়ে উঠলে কোন ধরনের ঋণে কতটা খেলাপির ঝুঁকি রয়েছে, সে বিষয়ে বাস্তব তথ্য ও ইতিহাস তৈরি হবে। এতে ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক করা সম্ভব হবে।
আলোচনায় ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েও মতামত উঠে আসে। বক্তারা বলেন, দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। একীভূতকরণের পাশাপাশি দুর্বল সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, দায় স্বীকৃতি, ব্যবস্থাপনা সংস্কার এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিনহাজ জিয়া, সিএফএ ও সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহতাব ওসমানি। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের প্রেসিডেন্ট মনির হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল। অনুষ্ঠানে যৌথভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমডি সাকিব চৌধুরী, এসএম গালিবুর রহমান ও মো. ইকবাল হোসেন।



















লেখাটি আপনার কেমন লাগলো?
মন্তব্য করতে সাইন-আপ বা লগইনের প্রয়োজন নেই - সরাসরি আপনার মতামত লিখুন।